পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন শুরু। ছবিঃ সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (স্পেশাল সামারি রিভিশন বা এসএসআর) শুরু করতে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এই প্রক্রিয়ায় নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা, ভোটার তালিকায় থাকা তথ্য সংশোধন এবং মৃত বা অন্যত্র স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন ও আপত্তি জানানো যাবে। তবে কোনো ভোটকেন্দ্রের মোট ভোটারের ২ শতাংশ বা তার বেশি নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এলে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি খতিয়ে দেখবে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তর।
কমিশনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি, সংশোধন ও বাদ দেওয়ার আবেদন এবং আপত্তি গ্রহণ করা হবে। সব প্রক্রিয়া শেষে আগামী ৪ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে।
কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো বুথে মোট ভোটারের তুলনায় ২ শতাংশ বা তার বেশি নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব জমা পড়লে তা নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরাসরি নিষ্পত্তি করা হবে না। বিষয়টি সিইও দপ্তরের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিককেও নিজে প্রস্তাবের যথার্থতা পরীক্ষা করতে হবে। একইভাবে কোনো ব্যক্তি পাঁচটি বা তার বেশি ক্ষেত্রে ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেওয়ার আপত্তি জানালে সেগুলোও আলাদাভাবে যাচাই করা হবে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং অযৌক্তিকভাবে ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি কমানোই এই যাচাইব্যবস্থার উদ্দেশ্য বলে নির্দেশনা থেকে বোঝা যাচ্ছে। তবে যাচাইয়ের পর কোনো আপত্তি গ্রহণ করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথিপত্রের ওপর।
এসএসআরের জন্য আধার কার্ড বাধ্যতামূলক নয় বলেও জানিয়েছে কমিশন। মৃত বা অন্যত্র স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে নির্ধারিত পোর্টালে আবেদন বা আপত্তি জানানো যাবে। পাশাপাশি কমিশন নির্দেশ দিয়েছে, একই পরিবারের সদস্যদের ভোটার তালিকায় একসঙ্গে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
এসএসআর ও এসআইআর এক ধরনের প্রক্রিয়া নয়। এসএসআর বা স্পেশাল সামারি রিভিশন হলো ভোটার তালিকার নিয়মিত সংশোধনপ্রক্রিয়া, যা সাধারণত প্রতিবছর করা হয়। এর মাধ্যমে নতুন ভোটারদের নাম তোলা, বিদ্যমান তথ্য সংশোধন এবং তালিকার ভুলত্রুটি দূর করা হয়। অন্যদিকে, এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন হলো ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনপ্রক্রিয়া। এতে ভোটারদের যোগ্যতা ও তালিকায় তাঁদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এসএসআরের এই ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর আগে রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ওই প্রক্রিয়ায় বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ ওঠে। বাদ পড়া ভোটারদের একাংশের আবেদন ও অভিযোগ এখনো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম বাদ পড়ায় সংশ্লিষ্ট ভোটাররা বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনেও তাঁদের ভোট দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভায় নির্বাচন সামনে থাকায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ ভোটাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে তাঁদের আবেদন নিষ্পত্তি না হলে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।
এদিকে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল্লিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিজেপিবিরোধী বিভিন্ন দল এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এমন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের মধ্যে এসএসআরের বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ায় নতুন সংশোধনপ্রক্রিয়ায় ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তি, তথ্য সংশোধন এবং নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের নির্দেশনা কীভাবে কার্যকর হয়, সেদিকে নজর থাকবে। বিশেষ করে কোনো বুথে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এবং একই ব্যক্তির একাধিক আপত্তি যাচাইয়ের নিয়ম বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটারদের আবেদন ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা কমিশনের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ভোটার তালিকায় যোগ্য ব্যক্তিদের নাম থাকা এবং ভুলভাবে কারও নাম বাদ না পড়া নিশ্চিত করতে সংশোধনপ্রক্রিয়ায় নির্ভুল যাচাই ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।
সূত্রঃ আনন্দবাজার