বাংলাদেশ

মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

রাজপথ থেকে সংসদ: অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরীর সংগ্রামী জীবন ও এক অন্তিম বেদনার উপাখ্যান

মতামতঃ মানিক লাল ঘোষ

  • 6:23 pm - October 16, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩৯ বার
মানিক লাল ঘোষ।ছবিঃ ওটিএন বাংলা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীনতার প্রতীক, তুখোড় বক্তা এবং “অগ্নিকন্যা” খ্যাত বেগম মতিয়া চৌধুরীর জীবন ও রাজনৈতিক অভিযাত্রা ছিল ইতিহাসের এক বিশাল ক্যানভাস। ১৯৪২ সালের ৩০ জুন পিরোজপুরের নাজিরপুরে জন্ম নেওয়া মতিয়া চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই জড়িয়ে পড়েন দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে।

ইডেন কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা ইডেন গার্লস কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি এবং ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ তথা ‘ডাকসু’-র সাধারণ সম্পাদক – জিএস নির্বাচিত হন। সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদে তাঁর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

এরপর ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগে বা ছাত্র ইউনিয়নে নারী নেতৃত্বের এমন অগ্রগামী ভূমিকা ও অগ্নিঝরা বক্তৃতার কারণেই চারদিকে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে এবং জনতা ও সহযোদ্ধারা তাঁকে ভালোবেসে ‘অগ্নিকন্যা’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

​ষাটের দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ছয় দফা ও এগারো দফা দাবির রাজপথে তিনি ছিলেন সামনের সারির লড়াকু যোদ্ধা। প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তাঁকে দীর্ঘ দুই বছর কারাভোগ করতে হয়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা, তদবির এবং আহতদের শুশ্রুষা ও সংগঠিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। স্বাধীনতাত্তর সময়ে বামপন্থী রাজনীতি থেকে ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীিতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্যের দায়িত্ব লাভ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে থেকে তিন দফায় (১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০১৯) কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে দেশের কৃষিখাতের আধুনিকায়ন ও খাদ্য নিরাপত্তায় অসামান্য ভূমিকা রাখেন। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নির্লোভ, সাদামাটা ও সততার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী পরবর্তী সময়ে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংসদ উপনেতার দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেন।
​

তবে দীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই নেত্রীর জীবনাবসান ঘটে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর, যখন তাঁর বয়স ছিল ৮২ বছর। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর পর তাঁর শেষ বিদায়ের পটভূমিটি দেশের পালাবদলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক চরম নির্মম ও বৈপরীত্যে রূপ নেয়। জীবদ্দশায় যিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংসদ উপনেতা ছিলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর সেই প্রয়াণলগ্নে প্রথাগত রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানগুলো অনুপস্থিত ছিল।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁর কোনো জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি এবং তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও নিতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত গার্ড অব অনার প্রদান ছাড়াই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। শেষ পর্যন্ত মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর স্বামী, প্রথিতযশা সাংবাদিক বজলুর রহমানের কবরের উপরেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
​

রাজনীতির পালাবদল বা ক্ষমতার সমীকরণ হয়তো সময়ের সাথে সাথে বদলে যায়, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে চব্বিশের এই বিদায়ের বেদনাবিধূর অধ্যায় এবং দীর্ঘ সংগ্রামমুখর বর্ণাঢ্য জীবন মুছে ফেলা যায় না। ছাত্র আন্দোলনের তুখোড় ডাকসু সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষপর্যায় পর্যন্ত মতিয়া চৌধুরীর অবদানের মূল্যায়ন যুগ যুগ ধরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবাবে।

( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি )

এই শাখার আরও খবর

দুই মাসের কম সময়ে ফের ঢাকায় ভুটানের রাজা, যাত্রাবিরতির আড়ালে কি ঘটছে?

দুই মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবতরণ করেছে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুককে বহনকারী একটি বিমান। শুক্রবার দুপুরে ড্রুক এয়ারের…

‘মব’ তকমায় যেভাবে আড়াল হচ্ছে পরিকল্পিত অপরাধ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ। এরপর ফেসবুক লাইভে মানুষকে জড়ো হওয়ার আহ্বান। অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের…

দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের নেপথ্যে তুরস্ক-পাকিস্তানের গোয়েন্দা তৎপরতা?

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক দুই কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পালকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর তাঁদের…

তারেক রহমানকে সরিয়ে ‘মাইনাস টু’ পরিকল্পনা, সক্রিয় ‘ডিপ স্টেট’?

সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে টানাপোড়েন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সম্ভাব্য বিশেষ বৈঠকের খবর ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জল্পনা।…

আইএমএফের ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে বাড়তি চাপের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে আলোচনা শুরু করবে বাংলাদেশ ও আইএমএফ। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলানো ও উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ধরে রাখার সুযোগ থাকলেও রাজস্ব সংস্কার,…

নিশ্চিন্তে উৎসব করুন, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au