উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার, যোগ্যতার নিচে কাজ করেন অর্ধেক
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবীদের প্রায় অর্ধেক এমন পেশায় কাজ করছেন, যেখানে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অর্জিত দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার…
শরতের শুভ্র মেঘ, কাশফুলের দোলা আর ঢাকের বাদ্যে ফিরে আসে শারদীয় দুর্গোৎসব। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে জেগে ওঠে পারিবারিক মিলন, সামাজিক সৌহার্দ্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচিত আবহ। মণ্ডপে স্বজনের সঙ্গে দেখা, প্রবাস থেকে ঘরে ফেরা, নতুন পোশাকে শিশুদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে আনন্দের এক আপন পরিসর। প্রতিবেশীর সেই আনন্দে অন্য ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণও বাংলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
দুর্গোৎসবের মর্মবাণী অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা। সমাজজীবনে এই আদর্শের প্রকাশ ঘটে অন্যায়ের প্রতিবাদে, নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোয় এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষায়। দেবীর আরাধনার সঙ্গে তাই ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ও নিরাপদে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে যুক্ত। উৎসবের আলোয় আমাদের চারপাশের অন্ধকারও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস আমাদের গর্বের। একই পাড়ায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বসবাস, বিপদে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো এবং পরস্পরের উৎসবে শরিক হওয়ার অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। কিন্তু অতীতের গৌরব দিয়ে বর্তমানের নিরাপত্তাহীনতা আড়াল করা যায় না। নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যে মানুষ আতঙ্কে থাকেন, তাঁর কাছে সম্প্রীতির আশ্বাস কতটা অর্থবহ? আক্রান্ত পরিবার কিংবা স্বজন হারানো মানুষের কাছে উৎসবের শুভেচ্ছার পাশাপাশি বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তাও পৌঁছাতে হবে।হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিজের—এইচআরসিবিএম—২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের প্রতিবেদনে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগসংবলিত ৮২৪টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, এসব ঘটনা দেশের ৬৩টি জেলায় বিস্তৃত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের একই সময়ের পৃথক প্রতিবেদনে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা এবং ৪৪টি হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।
সরকার কি এই উদ্বেগের যথাযথ উত্তর দিতে পারছে?
সারাদেশে এখন পিটিয়ে মেরে ফেলা, তুলে নিয়ে যাওয়া, হাত-পা বাধা লাশ খুঁজে পাওয়া, আর শিশুদের উপর নির্মমতা সবকিছুই এখন নিত্য দিনের ঘটনা।
কতটি অভিযোগের তদন্ত হয়েছে, কতটিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতজন অপরাধীর শাস্তি হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্য সরকারের ২০২৫ সালের জুনের দেশবিষয়ক তথ্যে বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই তথ্যে সংবিধানে সব ধর্মের সমান মর্যাদা ও অধিকারের নিশ্চয়তার কথাও রয়েছে।
চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের দীর্ঘ কারাবাসও ন্যায় বিচারকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। তিনি ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন। সেপ্টেম্বরের সংবাদ অনুযায়ী, একাধিক মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলার কারণে তাঁর মুক্তি হয়নি। প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই আটক অবস্থার অবসান এবং মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিরাপত্তা, ভূমির অধিকার ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাও দাবি করছি। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বসতভিটা ও জীবিকার ভূমির ওপর অধিকার রক্ষা, ভূমিবিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি এবং সহিংসতার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্গাপূজার সময় সারা বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা চোখে পড়ে। সরকারিভাবে পাশাপাশি অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে আরও বেশি পূজা আয়োজনে উৎসাহ দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে এমন একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়—বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিরাপদে ও আনন্দে জীবনযাপন করছেন এবং স্বাধীনভাবে ধর্মীয় আচার পালন করতে পারছেন। তবে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ও অনুদানের পাশাপাশি সারা বছর তাঁদের নিরাপত্তা, অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের মূল অগ্রাধিকার।
এই লোকদেখানো নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা কয়েক দিনের উৎসব ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নিজের বাড়িতে থাকা, ব্যবসা করা, জমির অধিকার রক্ষা করা, উপাসনা করা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা সারা বছর নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু নির্বিশেষে সব নাগরিক আইনের অধীনে সমান সুরক্ষা, মর্যাদা ও অধিকারের দাবিদার।
কাজী নজরুল ইসলামের একই বৃন্তের দুটি কুসুমের ভাবনা কিংবা শাহ আবদুল করিমের গানে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত জীবনের স্মৃতি আজও আমাদের স্পর্শ করে। সেই উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব বর্তমানের। প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে এসে, বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং অন্যায়ের বিচার দাবি করেই সম্প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করতে হবে।
এই শারদীয় দুর্গোৎসবে আমাদের প্রত্যাশা—চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মুক্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক; ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিরাপত্তা, ভূমি ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হোক। কোনো পরিবার যেন ভয় নিয়ে উৎসব পালন না করে, কোনো মানুষ যেন নিজের পরিচয়ের কারণে অধিকার হারানোর আশঙ্কায় না থাকেন। দেবীর আগমনী বার্তা আমাদের সাহস দিক এমন এক বাংলাদেশ গড়ার, যেখানে সম্প্রীতির অঙ্গীকারের সঙ্গে মানুষের জীবনের বাস্তব মিল থাকবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au