বাংলাদেশ

মতামতঃ অধ্যাপক ড. শ্যামল দাস

দেশে মবের রাজত্ব, জেএফকে’তে প্রতিবাদেই আপত্তি: বাংলাদেশে নিরীহ মানুষের রক্তপাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অপরাধ নয়

  • 2:52 pm - October 17, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫৬ বার
বাংলাদেশে নিরীহ মানুষের রক্তপাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অপরাধ নয়।ছবিঃ সংগৃহীত

ডঃ ইউনুসকে নাকি “হেনস্থা” করা হয়েছে। কারা করেছেন? “ফ‍্যাসিস্টের দোসররা”; কিভাবে করেছেন? তাঁরা জেএফকে বিমানবন্দরে ইউনুসকে “সন্ত্রাসী”, “শিশু হত্যাকারী” “দেশ ধ্বংসকারী”, এসব বলেছেন; জোরে বলেছেন, নাকি আস্তে বলেছেন? জোরে বলেছেন; অন‍্য কথায়, নোবেল বিজয়ী ইউনুসকে উচ্চস্বরে “টিপ্পনী” কাটা হয়েছে (ইংরেজী Heckle শব্দের অর্থ এইটিই মনে হয়েছে আমার)।

উচ্চস্বরে টিপ্পনী কাটার কারনে কি বলা যায় যে, তাঁরা মব করেছেন ইউনুসের বিরুদ্ধে? তাঁদের সকল নিরাপত্তা ধ্বংসকারী, তাঁদের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়ার জন‍্য দায়ী যিনি, দেশ ধ্বংসকারী, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে “রিসেট” করতে চাওয়া মানুষটি, অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের হত্যাকারী, শিশুহত‍্যকারী, সংখ্যালঘু ও নারী এবং নারীত্ত্বের অবমাননাকারীদের সমর্থনকারী যিনি, তাঁকে সামনে দেখার পর অন‍্য কীভাবে তাঁরা প্রতিবাদ জানাতে পারতেন?

তাঁদের সামনে অন্য কী বিকল্প ছিলো? এইটি ভাবা দরকার আমাদের সবার।  মনে রাখা দরকার, শোষিতের মানসিক  অবস্থা সব সময়ই শোষকের বিরুদ্ধে; সুযোগ পেলেই সে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করবে; কিন্তু যখন তার এই সুযোগটি কেড়ে নেয়া হবে তখন সে নিজেই সুযোগ তৈরী করে নেবে। এটাই হয়, এটাই হওয়ার কথা। তবুও দেখা যাক, এ ঘটনাটির প্রেক্ষাপট কেমল ছিলো? এটি কি ইউনুসকে যে উচ্চস্বরে টিপ্পনী কাটা হয়েছে তা থেকে প্রতিবাদকারীকে রেহাই দেয় যখন শোষিতের কন্ঠ রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে তার নিজদেশে?

একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটি অবশ্যই আলোচনার বিষয়। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে, কারো পুরষ্কার তাঁর ব্যক্তিগত অনৈতিক কর্মকান্ডের দায় থেকে তাঁকে রেয়াত দেয়না। ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, মব সহিংসতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক স্মারক ধ্বংসের ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি কোথায়?

এসব কাজের জবাবদিহি চাইবার সুযোগ ইউনুস রাখেননি; প্রতিপক্ষকে তিনি দমন করেছেন নিষ্টুরভাবে; আবার তাঁর অনুসারীদেরো লেলিয়ে দিয়েছেন এ আওয়ামী লীগ দমনের কাজে যেখানে দেশে আইনী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, পুলিশ রয়েছে। এই কাজটি তিনি করেছেন সচেতনভাবে। তাঁর চরিত্রের এই কালো দিকটির সাথে বাংলাদেশের পরিচয় ছিলোনা আগে।

ইউনুস একটি দেশের ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংগ্রামের যে ইতিহাস সেটিকে “রিসেট” বাটন টিপে উল্টোদিকে চালাতে চেয়েছেন; তিনি দেশটিকে একশ’ আশি ডিগ্রী ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন প্রাক-স্বাধীনতার সময়কালে; তিনি ক্ষমতা দখল করেছিলেন বাংলাদেশ বিরোধী শক্তিকে সাথে নিয়ে।

এক অর্থে ইউনুস আদর্শগতভাবে “রাজাকার” দর্শনের পৃষ্ঠপোষক। অন্য দিকে তিনি স্বাধীনতার পক্ষশক্তির কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছেন, এবং তাঁর এই কাজের প্রবাহমানতা বজায় রেখেছেন বর্তমান তারেক রহমান সরকার। তবে মনে রাখা দরকার, পাপ বাপকেও ছাড়েনা। ইউনুসের অবশ্য ভাগ্য ভালো যে, তাঁকে উচ্চস্বরে টিপ্পনী কাটা লোকজন ওইটুকেতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন; এর বেশী এগোননি; এগুলে কী ঘটতো তা কল্পনা করতেও ভয় হয়। দেশ ধ্বংসকারীকে ছাড় দেয়া সে দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ।

একজন সাবেক সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর সরকারের অধীনে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পদ, রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নোবেল পুরস্কার কাউকে রাজনৈতিক সমালোচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না। বরং শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনকারী একজন ব্যক্তির কাছে সহিংসতা প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রত্যাশা আরও বেশি হওয়াই স্বাভাবিক।

আজকের লেখার মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘটনাটির একটি ব্যবচ্ছেদ করা বিভিন্ন আঙ্গিকে।

প্রতিবাদ, হেকলিং এবং মব: একই আচরণের তিনটি নাম নয়

ইংরেজি Heckling বলতে সাধারণত কোনো বক্তা বা প্রকাশ্য ব্যক্তিত্বকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে প্রশ্ন, আপত্তি, বিদ্রূপ বা সমালোচনা প্রকাশ বোঝায়। এটি কখনো অশোভন, বিরক্তিকর কিংবা আক্রমণাত্মক ভাষার হতে পারে। কিন্তু সব হেকলিং অপরাধ নয়। অন্যদিকে মব সহিংসতা বলতে সংঘবদ্ধ জনতার মাধ্যমে শারীরিক আক্রমণ, মারধর, হত্যা, সম্পত্তি ধ্বংস কিংবা বেআইনি বলপ্রয়োগ বোঝায়। তবে শারীরিক আঘাত না ঘটলেও সংঘবদ্ধ হুমকি, অবরোধ বা ভয়ভীতি প্রদর্শন আইনগতভাবে গুরুতর হতে পারে।

জেএফকে বিমানবন্দরের ঘটনায় প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ইউনূসের বিরুদ্ধে মৌখিক প্রতিবাদ হয়েছে এবং নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে সরিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর ওপর শারীরিক আক্রমণের নিশ্চিত প্রমাণ এসব বিবরণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই ঘটনাটিকে বাংলাদেশের প্রাণঘাতী মব হামলার সমতুল্য বলা যুক্তিসংগত নয়।

মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে বিশেষ সুরক্ষা দেয়। কিন্তু বিমানবন্দরের মতো স্থানে নিরাপত্তা ও চলাচল নিশ্চিত করার জন্য যুক্তিসংগত নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে। সুতরাং মূল প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবাদকারীরা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, নাকি বেআইনি হুমকি বা বাধা সৃষ্টি করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

রাজনৈতিক অধিকার সংকোচন এবং প্রবাসীদের ক্ষোভ

২০২৫ সালের মে মাসে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর ফলে দলটির সভা-সমাবেশ, প্রচার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে রাজনৈতিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে পারে। কিন্তু অপরাধের ব্যক্তিগত দায় এবং একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার এক বিষয় নয়।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নিজে অপরাধ নয়। কোনো দলের সদস্য বা সমর্থক হওয়ার কারণে কাউকে আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। যখন কোনো রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী মনে করে যে দেশের ভেতরে তাদের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত, তখন তাদের ক্ষোভ প্রবাসে প্রকাশ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক হয়রানি বা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ থাকলে সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হতে পারে। আমার মনে হয়নি, প্রতিবাদকারীরা ইউনুসকে কোন হুমকি দিয়েছেন; তাঁরাতো ইউনুসের কাছে জবাব চাইতে অন্য কোন স্থানে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেননা; ইউনুসের বিরুদ্ধে দেশে মামলাও করতে পারবেননা; প্রতিকার চাইতে পারবেননা। তাহলে তাঁদের হাতে উপায়টা কী? উপায় একটাই; সেটি হলো, যেখানে যে অবস্থায় এই ব্যক্তিকে পাওয়া যাবে সেখানেই তাঁকে ভূক্তভোগীদের কথা জানিয়ে দিতে হবে; এটিই তাঁরা করেছেন।

ইউনুসের সরকার যে কেবল মবকারীদের ব্যপারে প্রশ্রয়ের নীতি অনুসরণ করেছিলো তাই নয়,  ইউনুস দেশে মব এবং নিরীহ মানুষ হত্যা ও অন্যান্য গোষ্ঠীর ওপর হামলাকে তাঁর বক্তব্য দিয়ে প্রভাবিত করেছিলেন। আমি এখানে একটি হিসেব দেবো, যা থেকে পাঠক বুঝে নেবেন ইউনুসকে কেন মবতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক বলা হয়। আমি এখানে সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেমোক্রেসি এন্ড গভর্নেন্স (সিজিডিজি) এর “Bangladesh Completes a Year of Mob Rule & Violence In the Shadow of Power” শীর্ষক রিপোর্ট থেকে পাওয়া সংখ্যাগুলো থেকে দেখাবো ইউনুস কেন মব কার্যক্রমের জন্য দায়ী।

ইউনূসের বক্তব্য, রাজনৈতিক সংকেত এবং সহিংসতার নৈতিক দায়

২০২৫ এর ১০ই ফেব্রুয়ারী ড. ইউনূস স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগপন্থীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং কিছু সহিংস ঘটনাকে রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছিলেন। মজার ব্যপার হলো, জানুয়ারীতে মবের কারনে মোট ২১ জন মানুষ জীবন হারিয়েছিলেন যেটি কমে এসেছিলো ফেব্রুয়ারীতে; মনে রাখা দরকার, ফেব্রুয়ারীর পাঁচ/ছয় তারিখে বত্রিশ নাম্বার ভাঙ্গা হলেও সেখানে কোন মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়না। আমার হিসেবে, তাঁর বক্তব্য দেয়ার কারনেই মবকারী দূবৃত্তরা উৎসাহিত হয়, এবং  ফেব্রুয়ারীর দশ তারিখের পর  মোট চৌদ্দ জন মানুষকে মব করে হত্যা করা হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মার্চ মাসে এটি এক লাফে বত্রিশে পৌঁছায়; এর আগে চব্বিশের আগষ্ট বাদ দিলে কেবলমাত্র অক্টোবরে বত্রিশ জন নিহত হয়েছিলো। পঁচিশের এপ্রিলে সাতাশ জন এবং মে’তে পঁচিশ জন মানুষ খুন হয় মবকারীদের হাতে  অর্থাৎ কার্যকারন না হলেও ইউনুসের বক্তব্যের সাথে মাসভিত্তিক নিহতের সংখ্যার একটি ধনাত্মক সহসম্পর্ক পাওয়া যায়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাজবৈজ্ঞানিক প্রশ্ন এখানেও থেকে যায়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষা কি কখনো এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে সমর্থকেরা মনে করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বেআইনি আচরণও গ্রহণযোগ্য?

আলবার্ট বানডুরা “নৈতিক বিচ্ছিন্নতা” তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ কখনো কখনো নৈতিক যুক্তির মাধ্যমে ক্ষতিকর আচরণকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করতে শেখে। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে যদি ক্রমাগত নৈতিকভাবে অযোগ্য, বিপজ্জনক কিংবা অধিকারবঞ্চিত করার উপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দুর্বল হতে পারে।

ইউনুসের ক্ষেত্রে এখানে তিন ধরনের দায় পৃথক করা জরুরি।

প্রথমত, প্রত্যক্ষ দায়। সহিংসতাকে যৌক্তিক বলে প্রচার; এগুলোর পরিকল্পনা বা অংশগ্রহণের প্রমাণ থাকার পরও এসবকে “অপরাধ” হিসেবে না দেখা; এতে তাঁর ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা যায়। মনে রাখা দরকার, বিবিসি’র সাথে সাক্ষাতকারে তিনি এসব কাজকে অভ্যুত্থানপর ব র্তী “উল্লাস” (Euphoria) বলে আখ্যায়িত করেন; এরপর পঁচিশের ফেব্রুয়ারীতে তিনি আওয়ামী লীগ বিরোধীদের সরাসরি আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করতে বলেন আইনের বাইরে যেয়ে।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক দায়। সরকারপ্রধান ও তাঁর প্রশাসন সহিংসতা প্রতিরোধ, তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ভূমিকা নিয়েছে, তা পরীক্ষা করা যায়। এটি পরিষ্কার যে, দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তাঁর স র কার কোন প্রশাসনিক ভূমিকা নেয়নি এসব কাজ ঠেকানোর জন্য।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়। নেতৃত্বের বক্তব্য, নীরবতা কিংবা সহিংসতার প্রতি দুর্বল প্রতিক্রিয়া অপরাধীদের মধ্যে বিচারহীনতার ধারণা তৈরি করেছে কি না, সেটি মূল্যায়ন করা যায়। এটি আমরা প্রমান করেছি মোটামুটি।

এই তৃতীয় প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সব সময় সরাসরি নির্দেশের মাধ্যমে সহিংসতাকে প্রভাবিত করে না। কখনো কখনো বক্তব্য, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং অপরাধের পর দুর্বল প্রতিক্রিয়াও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, এবং এই জায়গায় ইউনুসের দায় বিশাল।

ইউনুসের কৃতকর্মের কিছু নমুনাঃ বিপক্ষ মানেই মৃত্যুর মিছিলে সামিল

কানাডাভিত্তিক Global Center for Democratic Governance (GCDG)-এর Preliminary Report on the Brutally Murdered Leaders and Activists of Bangladesh Awami League and Affiliated Organizations প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২১৩ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

এই প্রতিবেদনের বিশেষ গুরুত্ব হলো, এটি শুধু একটি সামগ্রিক মৃত্যুসংখ্যা প্রকাশ করেনি। এতে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নাম, রাজনৈতিক পরিচয়, মৃত্যুর তারিখ, মৃত্যুর ধরন, ছবি, সংবাদসূত্র এবং QR কোড সংযুক্ত রয়েছে।

প্রতিবেদনে মৃত্যুর ধরনভিত্তিক হিসাব নিম্নরূপ:

মৃত্যুর ধরন সংখ্যা
পুড়িয়ে হত্যা ১৭
কুপিয়ে বা পিটিয়ে হত্যা ১২৮
গুলিতে মৃত্যু ১৫
কারাগারে মৃত্যু ২০
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু ১৩
অন্যান্য ২০
মোট ২১৩

 

এই পরিসংখ্যানের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১২৮ জনকে কুপিয়ে বা পিটিয়ে হত্যার শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এটি মোট তালিকাভুক্ত মৃত্যুর প্রায় ৬০ শতাংশ। কারাগার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা সম্মিলিতভাবে ৩৩টি।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, অনেক নিহত ব্যক্তির পরিবার যথাযথ আইনি প্রতিকার পায়নি। এর অন্যতম কারন হলো সরকার কর্তৃক এসব কাজের এক ধরনের লিখিত দায়মুক্তি প্রদান; এই সরকারেরই প্রধান ছিলেন ডঃ ইউনুস।

মব সহিংসতায় ৬৩৭ মৃত্যু: মৃত্যুর মিছিল বড় হয়েছে শুধুঃ শান্তির শাসনের আরেকটি  বাস্তব চিত্র

GCDG-এর আরেকটি প্রতিবেদন, Resurgence of Extremism in Bangladesh During the Interim Government: An Assessment of Emerging Threats (২৮ নভেম্বর ২০২৫), বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত মব সহিংসতায় অন্তত ৬৩৭ জন নিহত হওয়ার হিসাব উল্লেখ করেছে। একটি দেশে যদি সংঘবদ্ধ সহিংসতায় শত শত মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

সব মব হামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না। কোনোটি অপরাধের অভিযোগে গণপিটুনি, কোনোটি ব্যক্তিগত বিরোধ, কোনোটি রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু উদ্দেশ্য যা-ই হোক, বিচারবহির্ভূত সহিংসতা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; রাষ্ট্র সেটি করেনি যখন এটির সরকারপ্রধান ডঃ ইউনুস। মূল বিষয় হলো, একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন কতটা নিরাপদ ছিল তাঁর সময় এবং সহিংসতার পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

আরো কিছু জিনিস দেখা যাক।

ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা

GCDG-এর উগ্রবাদবিষয়ক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ২,৪৪২টি হামলার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সংকলনে ১৫২টি হিন্দু মন্দির এবং ১৮৫টি সুফি মাজার বা সমাধির ক্ষতির তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া নিজেই নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে আনে।

ধর্মীয় উগ্রবাদ শুধু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি বাউল, সুফি, লোকসংগীতশিল্পী, লেখক, নারী এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকেও সংকুচিত করতে পারে। GCDG প্রতিবেদনে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তার এবং তাঁর মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলার ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানিকগঞ্জে সংঘটিত ওই হামলায় অন্তত চারজন আহত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে রয়েছে।

ধর্মীয় অনুভূতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে একজন শিল্পীর কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং তাঁর সমর্থকদের ওপর আক্রমণ একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে। রাষ্ট্র কি নাগরিকদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছিল?

প্রতিবেদনে উগ্রবাদী সংগঠনের প্রকাশ্য তৎপরতা, খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে সমাবেশ এবং ধর্মীয় চাপের মুখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সরকার খুবই বিচ্ছিন্ন দুই একটি ঘটনা ছাড়া কোথাও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।  উদাহরণস্বরূপ, হিযবুত তাহরীরের প্রকাশ্য কর্মসূচি ঘিরে পুলিশি বাধা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এরপর কোন ফলো আপ দেখা যায়না। যথাযথ প্রশ্ন হলো, বিচ্ছিন্ন আইনগত পদক্ষেপের পরও কেন উগ্রবাদী সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ অব্যাহত ছিল এবং প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়েছিল?

 

ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্মৃতির ওপর আক্রমণ

২০২৫ সালের ৫–৬ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়ি ধ্বংসের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত। এই বাড়িটি শুধু একটি রাজনৈতিক নেতার বাসভবন ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের স্মৃতির সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা, গবেষণা বা বিতর্ক অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করে ইতিহাসের বিতর্ক নিষ্পত্তি করা যায় না।

GCDG-এর উগ্রবাদবিষয়ক প্রতিবেদনে ১,৪৯৪টি স্মারক ও ভাস্কর্য ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার একটি সংকলিত হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যার মূল উৎস ও গণনাপদ্ধতির আরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। তবু বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্য এবং সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনায় ইউনূস সরকারের প্রথম প্রতিক্রিয়াও বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত বলার পাশাপাশি শেখ হাসিনার বক্তব্যের ফলে সৃষ্ট জনরোষের সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞকে যুক্ত করে ব্যাখ্যা দিয়েছিল। পরে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষোভ কি কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে? একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য যতই আপত্তিকর হোক, তার প্রতিক্রিয়ায় সংঘবদ্ধ জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বৈধ হতে পারে না। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল কি? সামান্য থাকলেও সেই প্রতিক্রিয়া কতটা সময়োপযোগী ও কার্যকর ছিল, সেটিই মূল প্রশ্ন। সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, অপরাধীদের কতজন শনাক্ত হয়েছিল এবং কতজনের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এসব তথ্য প্রকাশ্য জবাবদিহির অংশ হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত স্মারক ও স্থাপনা রক্ষা করা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক দায় নয়। এগুলো জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। ইতিহাসের স্মৃতি ধ্বংস হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতির সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।

বিচারহীনতার ধারণা ও সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ

সমাজবিজ্ঞানে Perceived Impunity বলতে এমন ধারণাকে বোঝানো যায়, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে অপরাধ করেও শাস্তি এড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে Normalization of Violence বলতে বোঝায়, সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ফলে সমাজে সেটিকে ক্রমশ স্বাভাবিক রাজনৈতিক বা সামাজিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা। এই দুই বিষয়ে ইউনুস প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। যখন সংঘবদ্ধ হামলার পর অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয় না, তখন ভবিষ্যৎ সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একইভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণকে জনরোষ বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে বারবার ব্যাখ্যা করা হলে সহিংসতার নৈতিক সীমারেখা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটি নির্দিষ্ট প্রতিটি ঘটনার কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সমাজবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিশোধের সংস্কৃতি নতুন নয়। বিভিন্ন শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, হয়রানি এবং রাজনৈতিক অধিকার সংকোচনের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু পূর্ববর্তী অন্যায় নতুন অন্যায়কে বৈধতা দিতে পারে না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন নতুন সরকার প্রতিশোধের পরিবর্তে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে।

প্রবাসীদের প্রতিবাদ:  আপেক্ষিক বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ

সমাজবিজ্ঞানী টেড রবার্ট গারের ‘আপেক্ষিক বঞ্চনা’ (Relative Deprivation) তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের প্রত্যাশিত অধিকার ও বাস্তবে প্রাপ্ত সুযোগের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হলে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও ক্ষোভ জন্ম নিতে পারে। অন্যদিকে জেমস সি. স্কটের রাজনৈতিক প্রতিরোধবিষয়ক বিশ্লেষণ দেখায়, ক্ষমতার অধীনে থাকা জনগোষ্ঠীর পুঞ্জীভূত অসন্তোষ বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। এই দুটি ধারণার আলোকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিবাদকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই দুটি ধারণা প্রাসঙ্গিক।

যাঁরা মনে করেন দেশে তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ জমা হতে পারে। প্রবাসে তুলনামূলক স্বাধীন পরিবেশে সেই ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ বেশি থাকতে পারে। জেএফকে বিমানবন্দরের ঘটনাকে এই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটেও বিশ্লেষণ করা যায়।

একই আচরণের ভিন্ন নাম: রাজনৈতিক দ্বৈত মানদণ্ড

বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ জনতার হাতে বাড়িঘর ধ্বংস, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বাধা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মারধর কিংবা হত্যার ঘটনাকে যখন ‘জনরোষ’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়, অথচ বিদেশে একজন সাবেক সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে মৌখিক প্রতিবাদকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—একই ধরনের রাজনৈতিক আচরণের বিচারে এত ভিন্ন মানদণ্ড কেন? এই প্রবণতাকে বলা যায় ‘নির্বাচিত ঘটনাবিন্যাস’ (Selective Framing), অর্থাৎ রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ঘটনার বিশেষ অংশ তুলে ধরে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা। একইভাবে ‘নৈতিক দ্বৈত মানদণ্ড’ (Moral Double Standards) বলতে বোঝায়, রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বার্থের ভিত্তিতে একই নৈতিক নীতির ভিন্ন প্রয়োগ।

এ ধরনের রাজনৈতিক বর্ণনাকে কেউ কেউ ‘গ্যাসলাইটিং’ বলতে পারেন। তবে মনোবিজ্ঞানে গ্যাসলাইটিং বলতে সাধারণত এমন ধারাবাহিক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারকে বোঝায়, যার মাধ্যমে একজন মানুষকে নিজের উপলব্ধি, স্মৃতি বা বাস্তববোধ নিয়ে সন্দিহান করে তোলা হয়। তাই এখানে ‘বাছাই করা রাজনৈতিক বয়ান’ এবং ‘নৈতিক দ্বৈত মানদণ্ড’ পরিভাষা দুটি অধিক যথাযথ।

মূল প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল: বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ সহিংসতা যদি অপরাধ না হয়, তাহলে বিদেশে শান্তিপূর্ণ মৌখিক প্রতিবাদকে একই অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখানো হবে কেন? আইন ও নৈতিকতার মানদণ্ড কি ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী বদলে যাবে? গণতন্ত্রে সহিংসতা বিচার করার মানদণ্ড সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দলের সমর্থক, কারও ওপর সংঘবদ্ধ হামলা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও শুধু তাঁর পরিচয়ের কারণে অপরাধ হয়ে যায় না।

নোবেল শান্তি পুরস্কার: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব পরীক্ষা

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন। ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। অতীতের অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার সফলতা একই বিষয় নয়। একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সরকারপ্রধানেরও নাগরিকের জীবন রক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ সংরক্ষণের দায় রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে জেএফকে বিমানবন্দরের প্রতিবাদকে কেবল একজন নোবেল বিজয়ীর ব্যক্তিগত অপমানের ঘটনা হিসেবে দেখলে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। প্রতিবাদকারীদের আচরণ অশোভন হতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে তার বিচারও হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের আড়ালে বাংলাদেশে সংঘটিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, মব সহিংসতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং ঐতিহাসিক স্মারক ধ্বংসের প্রশ্ন হারিয়ে যেতে পারে না।

শান্তির প্রকৃত পরীক্ষা ক্ষমতাহীন মানুষের নিরাপত্তায়

জেএফকে বিমানবন্দরের ঘটনাটি আমাদের সামনে দুটি ভিন্ন কিন্তু সম্পর্কিত প্রশ্ন নিয়ে এসেছে।

প্রথম প্রশ্ন, একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে উদ্দেশ করে রাজনৈতিক প্রতিবাদের সীমা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন কতটা নিশ্চিত হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ঘটনা, পরিসংখ্যান, স্বাধীন তদন্ত এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ভিত্তিতে।

GCDG-এর নাম, ছবি ও সংবাদসূত্রসহ ২১৩ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা, মব সহিংসতায় ৬৩৭ জনের মৃত্যুর সংকলিত হিসাব, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ, বাউল-সুফি সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ধ্বংসযজ্ঞ, এসব বিষয় একত্রে একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

রাষ্ট্র কি রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিচার, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর স্বচ্ছ মূল্যায়ন। নোবেল শান্তি পুরস্কার একজন ব্যক্তির অতীত অবদানের স্বীকৃতি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় শান্তির প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় একজন বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীর নিরাপত্তায়, একজন সংখ্যালঘু নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতায়, একজন শিল্পীর নির্ভয়ে গান গাওয়ার অধিকারে এবং একজন সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তায়।

প্রশ্ন তাই শুধু নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে কে কী বলেছেন, সেটি নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে যাঁরা নিহত, আক্রান্ত কিংবা অধিকারবঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের জন্য রাষ্ট্র কতটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পেরেছিল? কারণ শান্তির প্রকৃত পরীক্ষা পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চে নয়, ক্ষমতাহীন মানুষের জীবন, স্বাধীনতা এবং অধিকার রক্ষায়।

এই শাখার আরও খবর

কক্সবাজারে রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন, পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার

কক্সবাজারের ইনানীতে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আগুনে পুড়ে রিসোর্টটি প্রায় সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন হতাহত হয়ে থাকতে…

কৃত্রিম টাইফুনের অভিজ্ঞতা নিতে চীনে পর্যটকদের ভিড়, বাড়ছে ‘ডার্ক ট্যুরিজম’

চীনে দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি কৃত্রিম টাইফুন, বন্যা, ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের অভিজ্ঞতা নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন পর্যটকেরা। দেশটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে…

মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে টোকিওতে গোপন বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের

জাপানের রাজধানী টোকিওতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী-সমর্থিত সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকটি এক মাসের মধ্যে দুই পক্ষের দ্বিতীয় আলোচনা।…

সীতাকুণ্ডে গুলি করে যুবককে হত্যা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তারেক হোসেন বাপ্পি (২৬) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তাফসির আলম শাওন (২২) নামে আরও এক যুবক।…

নেত্রকোনায় গুলিতে নিহত সাংবাদিক, আগেও হামলার শিকার হয়ে ছিলেন ঝুঁকিতে

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও চোরাচালানের অভিযোগ নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি। এর আগেও তাঁর…

ইস্তাম্বুলে ৮০ বছরের ভয়াবহ বন্যা, প্রাণ গেল চারজনের

তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলে গত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। টানা ভারী বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au