ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে নেতানিয়াহুকে পুনর্নির্বাচিত করার বিষয়ে সরাসরি সমর্থন জানাতে অনীহা প্রকাশ করলেও এবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তাঁর প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধ্বংস করার দাবি তুলে তিনি বলেছেন, তেহরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন না করলে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই বাকি কাজ শেষ করবে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অথবা পরে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে ওয়াশিংটন। তবে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনকে দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনো সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই সমর্থন ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ এবং কূটনৈতিক আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন
রোববার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘একজন মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী এবং শান্তির জন্য আরও মহান অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি দাবি করেন, ইরানকে সামরিক ও আর্থিকভাবে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। তেহরান দ্রুত নিজেদের নীতি পরিবর্তন না করলে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই বাকি কাজ শেষ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্প লেখেন, ইসরায়েলে যদি ভুল নেতা নির্বাচিত হন, অর্থাৎ ‘বিবি’ নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেরাই এই কাজ করতে হবে। তবে তিনি নিজে সে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন বলেও উল্লেখ করেন।
নেতানিয়াহুকে ‘শক্তিশালী, সাহসী ও মেধাবী’ উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলের ভেতর থেকেও বিরোধিতা এবং ব্যাপক চাপের মুখে পড়েও তিনি টিকে থেকেছেন, বরং আরও শক্তিশালী হয়েছেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, নেতানিয়াহুর ওপর যে চাপ ছিল, সাধারণ মানুষ হলে তা সহ্য করতে পারতেন না। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সেই চাপের মুখে দুর্বল না হয়ে আরও শক্তিশালী হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলকে এমন একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন, যাকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সহায়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এমন একজন অংশীদার চায়, যিনি নেতানিয়াহুর মতো দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বার্তার শেষাংশে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর আসন্ন পুনর্নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজের ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন’ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু কখনো তাঁর সমর্থকদের হতাশ করবেন না।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর আগে নেতানিয়াহুর নির্বাচনে সরাসরি সমর্থন দেওয়া নিয়ে প্রশ্নের মুখে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
চলতি মাসের শুরুতে টাইম ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুকে আরেক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া উচিত কি না, এমন প্রশ্ন দুবার করা হলেও ট্রাম্প সরাসরি উত্তর দেননি। বরং ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনে নিজের জনপ্রিয়তা এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
এ ছাড়া বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি ইসরায়েলের নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে চান কি না। জবাবে তিনি বলেন, ইসরায়েলিরা তাঁকে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে দেখতে চায়।
নেতানিয়াহুকে তিনি বিশ্বাস করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না।’
ইসরায়েলের নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে ট্রাম্পের সমর্থন?
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। তবে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দলের অবস্থান ও সম্ভাব্য আসনসংখ্যার হিসাব বলছে, কোনো পক্ষের জন্য একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সহজ হবে না।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের প্রকাশিত নির্বাচনী পূর্বাভাস অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টিকে কেন্দ্র করে গঠিত বিরোধী জোট সর্বোচ্চ ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫১টি।
অর্থাৎ, পূর্বাভাস অনুযায়ী কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে না। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল মনে করেন, নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কয়েক মাস ধরে দুই নেতার মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছিল, তার পর এই ঘোষণা এসেছে।
আল জাজিরাকে ভাকিল বলেন, এই সমর্থন নেতানিয়াহুর সেই দাবিকে আরও জোরালো করতে পারে যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনিই অপরিহার্য নেতা।
তবে নির্বাচনে এর প্রভাবকে অতিরঞ্জিত না করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এবং ইরান যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ইসরায়েলি ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর বিদ্যমান সমর্থকদের আরও সুসংহত করতে পারে, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক রেকর্ড ঘিরে থাকা বৃহত্তর প্রশ্নগুলোর সমাধান করবে না।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে নেতানিয়াহুর জন্য ‘রাজনৈতিক উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচার যখন নানা সমস্যার মুখে রয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য সমর্থন তাঁকে কিছুটা সুবিধা দিতে পারে।
তবে ক্রিগও মনে করেন, এই সমর্থন নির্বাচনের ফল পুরোপুরি বদলে দেওয়ার মতো নয়।
তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর সমস্যার মূলে রয়েছে ডানপন্থী দলগুলোর বিভক্তি, অতি-রক্ষণশীল ইহুদি ভোটারদের একাংশের হতাশা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
ট্রাম্পের সমর্থন লিকুদ পার্টির যেসব ভোটার দ্বিধায় রয়েছেন, তাঁদের একাংশকে ভোটকেন্দ্রে আনতে পারে। এতে কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক বা দুটি আসন বাড়তেও পারে। কিন্তু বর্তমানে যে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি রয়েছে, শুধু ট্রাম্পের সমর্থন দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ক্রিগ।
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ট্রাম্পের সমর্থনের সম্পর্ক কী?
নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার বড় অংশজুড়েই ছিল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ। এ কারণে নতুন করে হামলা শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূচনা হয়। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতি কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। তবে সামরিক চাপ, নৌ অবরোধ এবং পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ একসময় এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে এর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইরানের পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করে। এরপর দুই পক্ষই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালায়। উভয় পক্ষের অভিযোগ, এসব জাহাজ তাদের দেওয়া নির্দেশনা অমান্য করেছিল।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ক্রমবর্ধমানসংখ্যক তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালিটি পার করায় তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে গিয়েছিল। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে ইরানের একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর আবারও হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তিমূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৫৭ ডলারে দাঁড়ায়। শুক্রবার দাম সাময়িকভাবে ১১০ ডলারে পৌঁছেছিল, যা গত ১৯ মে-র পর সর্বোচ্চ পর্যায়। পরে দাম কিছুটা কমে আসে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতই বাড়বে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের প্রস্তাব
সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে গত মাসে ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান। প্রস্তাব অনুযায়ী, সাত দিনের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার কথা ছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উত্থাপিত সাতটি শর্তের বিষয়ে সম্মতি না দেওয়ায় আলোচনা ব্যর্থ হয়। ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে ছিল দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের অবসান।
রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দেশটির সংবাদমাধ্যমকে জানান, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব এখনো বহাল রয়েছে। ওয়াশিংটন তেহরানের শর্তগুলো মেনে নিলে ছয় দিনের মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব। এর পরদিনই আলোচনা আবার শুরু হতে পারে।
তবে ইরানের এই প্রস্তাবের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক সংঘাত উসকে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে তেহরান।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি অভিযোগ করেন, নিজের বিরুদ্ধে চলমান আইনি ঝুঁকি থেকে বাঁচতে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও হামলা চালাতে চান।
তিনি লেখেন, আগেরবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন কাজ শেষ করার চেষ্টা করেছিল, তখন ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। আবারও একই চেষ্টা করতে চাইলে ইরান প্রস্তুত রয়েছে। তবে ইরানেরও কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
আরাঘচির অভিযোগ, নেতানিয়াহু নিজের আইনি পরিণতি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছেন। এতে ইসরায়েলের কী পরিণতি হবে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে নেতানিয়াহু নিজের আইনি পরিস্থিতি এড়াতে নতুন যুদ্ধের চেষ্টা করছেন, আরাঘচির এই বক্তব্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ। স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে একে বিবেচনা করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ইরানে হামলা চালাতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে শুধু নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখলে এর কৌশলগত গুরুত্ব উপেক্ষিত হতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি এবং কূটনৈতিক আলোচনায় নিজেদের শর্ত আদায়ের প্রচেষ্টাও এর সঙ্গে যুক্ত।
কিংস কলেজের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, ট্রাম্প বর্তমানে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য জবরদস্তিমূলক কৌশলগত সুবিধা বা ‘কোয়েরসিভ লিভারেজ’ ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি কূটনীতির পরিবর্তে যুদ্ধকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
ক্রিগ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ইরানকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপে ফেলছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে। ট্রাম্পের হিসাব হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমেই বড় ধরনের ছাড় দিতে না হলেও শেষ পর্যন্ত ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দিতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য হবে।
নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন এই কৌশলের পেছনে থাকা সামরিক হুমকিকে আরও জোরালো করে তুলছে। তবে এতে কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, এমনটা মনে করেন না ক্রিগ।
তাঁর মতে, ট্রাম্প এখনো এমন একটি চুক্তি চান, যেটিকে তিনি নিজের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন। তবে বিপদ হচ্ছে, তেহরান যদি মনে করে আলোচনায় সুবিধা পেতে হলে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে হবে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঘিরে সংঘাত নতুন করে বড় যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্পের সমর্থন কি যৌথ সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত?
চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিলের মতে, নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমন্বয়কে নতুন করে জোরালো করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দুই দেশের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রেখেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই নেতা ইতিমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক অভিযানের বিষয়ে একমত হয়েছেন।
ভাকিলের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান তাঁকে ইরান যুদ্ধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার সুযোগও কমিয়ে দিচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়া একটি পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ থাকলেও এখন সেই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই ইসরায়েলের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের দায় নিজের কাঁধে নিচ্ছেন। তবে দুই নেতা নতুন কোনো অভিযান নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছেন কি না, কিংবা যুদ্ধ শুরুর পেছনে প্রথমে কার ভূমিকা বেশি ছিল, ট্রাম্পের সমর্থনের ঘোষণা থেকে তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
ভাকিলের মতে, তেহরান এই বক্তব্যকে এমন একটি বার্তা হিসেবে দেখতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে কার্যকর কোনো পার্থক্য নেই। এতে ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে দুই দেশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্পের অনীহার ইঙ্গিতকে ওয়াশিংটনের আরেকটি যুদ্ধ শুরু করার সীমিত আগ্রহের প্রমাণ হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে পারে তেহরান।
অর্থাৎ, ট্রাম্পের বক্তব্য একই সঙ্গে দুই ধরনের বার্তা দিচ্ছে। একদিকে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন কতটা এগোতে প্রস্তুত, তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে।
নভেম্বরের নির্বাচনের পর বাড়তে পারে হামলার ঝুঁকি
ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় পেন্টাগন পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দুই দেশের নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তবে এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নতুন হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, ইরান এমন কোনো হামলা না চালালে, যার জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে নতুন হামলা চালানোর সম্ভাবনা আপাতত কম।
তবে তাঁর মতে, সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় শুরু হতে পারে ৩ নভেম্বরের পর, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হবে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিবেচনায় যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ভোটের পর তা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
ক্রিগ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তা থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে হামলা অবশ্যম্ভাবী।
তাঁর মতে, তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কোনো সংঘাত। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দুই নেতা রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই ওয়াশিংটনকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে হতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার হলেও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের বক্তব্য নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে সহায়তা করতে পারে এবং তেহরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব বহাল রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধের মাধ্যমে তেহরানের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না এলে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে কি না, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের ফল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করলে ইরান ইস্যুতে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটি পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠবে। তবে নির্বাচনী ফলাফল সরাসরি সামরিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ধরন বদলাতে পারে। তখন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক।
সূত্রঃ আল-জাজিরা