বাংলাদেশ

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

ঋণ করে বিদেশে পাঠানো ছেলের মৃত্যুদণ্ড, বিচার ও মরদেহ ফেরত চান বাবা

  • 6:01 am - October 20, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭৬ বার
সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নজরুলের বাবা। ছবিঃ সংগৃহীত

সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির জানিয়েছেন, সুইটি আক্তার তাঁর ছেলের স্ত্রী নন। এমনকি ওই তরুণীকে তাঁদের পরিবার চেনেও না। ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝা ও তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে পরিবারটি।

নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা কাটানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ। কিন্তু সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর টানা তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত বুধবার তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

‘ওই মেয়ে নজরুলের স্ত্রী নয়, তাকে আমরা চিনিও না’

নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, ছেলেকে কলেজে পড়ার সময় পরিবারের হাল ধরার আশায় বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ছেলের বিয়ে কিংবা সুইটি আক্তারের সঙ্গে তাঁর কোনো দাম্পত্য সম্পর্কের বিষয়ে পরিবারের কিছু জানা নেই।

জাগো নিউজকে আব্দুল বাছির বলেন, “ছেলেকে কলেজে পড়ার সময় পরিবারের হাল ধরতে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। সে বিয়ে করল কখন? ওই মেয়ে নজরুলের স্ত্রী নয়, তাকে আমরা চিনিও না। শুনেছি, তারা একই জায়গায় কাজ করত।”

নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে যে তথ্য ছড়িয়েছে, সেটিও সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন তাঁর বাবা। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি তাঁরা।

আব্দুল বাছির জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার পর মাত্র ছয় মাস কাজ করতে পেরেছিলেন নজরুল। এরপর তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়। তবে কী কারণে তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানতে পারেননি তিনি।

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পরিবারের জন্য আরেকটি শোকের ঘটনাও নিয়ে এসেছে। তাঁর বাবা জানান, ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়ে নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম বুধবার রাতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

সাত লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল নজরুলকে

নজরুলের বিদেশযাত্রার পেছনে ছিল পরিবারের আর্থিক সংকট কাটানোর আশা। তাঁকে সৌদি আরবে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তাঁর বাবা। কিন্তু বিদেশে গিয়ে কাজ করার সুযোগ খুব বেশি দিন পাননি নজরুল। পরিবারের কাছে তিনি মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন বলে জানিয়েছেন আব্দুল বাছির।

তিনি বলেন, “সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এর মধ্যে দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। ঋণদাতারাও আমাকে চাপ দিচ্ছেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই। আমার ছেলেকে বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকলে এর বিচার চাই।”

ছেলের মৃত্যুর শোকের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চাপও সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে এখন কীভাবে সংসার চলবে, সেই অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে।

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে গ্রামের মানুষ তাঁদের বাড়িতে যাচ্ছেন। স্বজনদের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি সমবেদনা জানাচ্ছেন প্রতিবেশীরা।

মক্কার মসজিদে গ্রেপ্তারের কথা জানতেন স্বজনেরা

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে নজরুল ও সুইটিকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ।

নজরুলের গ্রেপ্তারের খবর তখন তাঁর পরিবার জানতে পেরেছিল। তবে কী অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেনি পরিবারটি। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর গত বুধবার দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

তবে গ্রেপ্তারের অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিরা।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, নজরুল এমন কোনো অপরাধ করেছেন বলে তিনি মনে করেন না, যার জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

গাজী নিয়াজুল করিমের অভিযোগ, এ ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের যথেষ্ট অবহেলা ছিল। তাঁর দাবি, দূতাবাস কার্যকরভাবে যোগাযোগ করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সাজা হয়েছিল। সে সময় সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস উদ্যোগ নিয়ে ওই নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নজরুলের পরিবারের সঙ্গে এখন পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে দূতাবাসের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

মৃত্যুদণ্ড ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ

নজরুলের গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিন এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, সৌদি আরবের বিভিন্ন সামাজিক নীতিতে পরিবর্তন এলেও মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির ক্ষেত্রে আইনি সংস্কার নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

নজরুলের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

রাহাত ও মাইনুদ্দিন বলেন, দরিদ্র কৃষক পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন নজরুল। তাঁকে হারিয়ে পরিবারটি আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সরকার ও সৌদি আরবের সরকারের কাছে নজরুলের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

মরদেহ ফেরত ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য চান পরিবার

নজরুলের পরিবারের প্রধান চাওয়া এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া। কী অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, আদালতে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবার বা বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানানো হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিবারের কাছে স্পষ্ট নয়।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরুল ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও নজরুলের বাবা সেই দাবি নাকচ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সুইটি আক্তারকে তাঁদের পরিবার চেনে না এবং তিনি নজরুলের স্ত্রী নন।

পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া নিয়ে ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন নজরুলের পরিবারের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করবে এবং তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।

এই শাখার আরও খবর

রাষ্ট্রপতির মন্তব্যে হেফাজতের তীব্র প্রতিবাদ, বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ইসলামের মৌলিক তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক…

পূজায় নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, অংশ নিলে ঈমান থাকবে না: বায়তুল মোকাররমের খতিব

দেশে বসবাসরত অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতী আব্দুল মালেক। তবে উদারতা বা…

৯ মাসে মব সহিংসতায় নিহত ১৮৭, ধর্ষণের শিকার ৬৫৭ নারী ও শিশু

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, সারা দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার…

অষ্টমী পূজার দিনে গ্রেপ্তার ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগরওয়ালা

দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সোমবার (১৯…

নেতানিয়াহুর পাশে ট্রাম্প, ইরানে নতুন হামলার ছক কষছে যুক্তরাষ্ট্র?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে নেতানিয়াহুকে পুনর্নির্বাচিত করার বিষয়ে সরাসরি সমর্থন জানাতে অনীহা প্রকাশ করলেও…

‘যুদ্ধ বন্ধের ইচ্ছা জেলেনস্কির কখনোই ছিল না’: ট্রাম্প

রাশিয়ার সঙ্গে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আগ্রহ নেই বলে অভিযোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au