ওটিএন বাংলা ডেস্ক: রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই—বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধের সমষ্টি হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা কঠিন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের পর স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
১৯ অক্টোবর ২০২৬ আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এমন চিত্র তুলে ধরেছেন শাফী মো. মোস্তফা ও রাগিব আনজুম। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো কিংবা অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশি ব্যবস্থা।
সহিংসতার পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
বিশ্লেষণটিতে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির—এইচআরএসএস—তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ১২ শতাংশ। একই তুলনায় সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতার ঘটনা ৯৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৭টি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গণসহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ৫১ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২৮ এবং ২০২৫ সালে ১৯৭ জন। অন্যদিকে, পুলিশের হিসাবে নিবন্ধিত হত্যা মামলার সংখ্যা ২০২৩ সালের ৩ হাজার ২৩টি থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৮৬টিতে।
এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে চাঁদাবাজি, সশস্ত্র সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখলে নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ স্পষ্ট হয় বলে লেখকেরা মনে করেন।
পুলিশের সংকটের শিকড় দীর্ঘদিনের
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুলিশের প্রতি জনসাধারণের আস্থার সংকটের পেছনে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নিয়ন্ত্রণমূলক পুলিশি সংস্কৃতি স্বাধীন বাংলাদেশেও বহাল থেকেছে। বিভিন্ন সরকার আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিরোধী মত দমনে পুলিশকে ব্যবহার করেছে বলে লেখকেরা উল্লেখ করেছেন।
তাঁদের মূল্যায়নে, রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রভাব ও দুর্নীতি যখন পেশাগত অগ্রগতির নিয়ামক হয়ে ওঠে, তখন পুলিশের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস আরও গভীর করেছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলায়। প্রতিবেদনের হিসাবে, দেশের ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৪৫০টি হামলার পর অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং পুলিশের প্রায় ৩০ শতাংশ পদ সাময়িকভাবে শূন্য হয়।
পরবর্তী সময়ে থানার কার্যক্রম পুনরায় চালু হলেও জনবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আগে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করে কাজ করা কর্মকর্তারাও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংঘাত মোকাবিলায় ঝুঁকির মুখে পড়েন বলে লেখকদের পর্যবেক্ষণ।
পোশাক বদলালেও বদলায়নি জনধারণা
পুলিশের পোশাকের রং ও প্রতীকে পরিবর্তনের উদ্যোগ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটকে পুলিশ সংস্কার কমিশনের এক সদস্য অভিযোগ করেছেন, সংস্কারের সুপারিশগুলো বিএনপি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি এবং পুলিশ সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি। এটি ওই কমিশন সদস্যের বক্তব্য হিসেবে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের একটি জরিপের তথ্য উল্লেখ করে বিশ্লেষণটিতে বলা হয়, পুলিশের কাজে অসন্তোষ জানিয়েছেন ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা; সন্তোষ জানিয়েছেন ৪৫ শতাংশ। জরিপে অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পুলিশ সবচেয়ে কম জনসমর্থন পেয়েছে।
স্থানীয় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লড়াই
আইনশৃঙ্খলার অবনতির আরেকটি বড় কারণ হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো বদলে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন লেখকেরা।
তাঁদের বিশ্লেষণে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে পরিবহন টার্মিনাল, বাজার, নির্মাণকাজের ঠিকাদারি, জমি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ দলসংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্কের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। সরকার পতনের পর সেই কাঠামো ভেঙে গেলে আগে বাইরে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রতিযোগিতায় নামে।
ফলে রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ের সঙ্গে চাঁদাবাজি, সম্পত্তি ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের বিরোধ জড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশ রাজধানীতে ১ হাজার ২৮০ জন সক্রিয় চাঁদাবাজকে চিহ্নিত করে, যাদের মধ্যে ১৪৮ জন সশস্ত্র অপরাধী। এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নথিভুক্ত ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত এবং সাত হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এসব সংঘর্ষের অনেকগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাব ও অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণের বিরোধ যুক্ত ছিল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধও বড় কারণ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পরও স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এইচআরএসএসের হিসাবে, জুলাই–সেপ্টেম্বরের ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে ৬৯টি ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ। আরও ৯২টি ঘটনায় বিএনপির সদস্যদের সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংঘাত হয়েছে।
লেখকদের মতে, একই রাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা তৃণমূলের সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। দুর্বল পুলিশি ব্যবস্থা ও স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পরস্পরকে আরও জটিল করে তুলছে।
আস্থা ও স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার তাগিদ
বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গৃহীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, যার উদ্দেশ্য ছিল তদারকি ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা, পরবর্তী সময়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এতে পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির জন্য পরিকল্পিত কাঠামো কার্যকর রাখার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
লেখকদের সুপারিশ, সরকারের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব হওয়া উচিত পুলিশের কার্যকর কর্তৃত্ব পুনর্গঠন করা এবং একই সঙ্গে পুলিশি কার্যক্রমকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
তাঁদের মতে, টেকসই আইনশৃঙ্খলার জন্য জনগণের আস্থা অর্জন, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বন্ধ করা জরুরি। এসব পরিবর্তন ছাড়া ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক বদলালেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট, ১৯ অক্টোবর ২০২৬; শাফী মো. মোস্তফা ও রাগিব আনজুমের বিশ্লেষণ অবলম্বনে।