বিশ্ব

নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি: ফিলিস্তিনপন্থী সমাজতান্ত্রিকের উত্থান

  • 6:31 am - November 07, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৩৩৪ বার
৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্রেটিক সমাজতান্ত্রিক নেতা জোহরান মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৭ নভেম্বর- ৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্রেটিক সমাজতান্ত্রিক নেতা জোহরান মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তিনি ১৯৬৯ সালের পর প্রথম প্রার্থী যিনি ১০ লাখের বেশি ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হলেন এবং মোট ভোটের ৫০ শতাংশেরও বেশি অর্জনের পথে আছেন।

প্রায় সব ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুয়োমো পেয়েছেন প্রায় ৪১.৬ শতাংশ ভোট, আর রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া পেয়েছেন মাত্র ৭ শতাংশ।

আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলিম এই রাজনীতিবিদ নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। তিনি একটি বামপন্থী র‌্যাডিক্যাল কর্মসূচি নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন, যেখানে ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে বিনামূল্যে বাসসেবা ও শিশু যত্ন সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এছাড়া তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করবেন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে আগেই “হামাসের মুখপাত্র” বলে অভিহিত করেছে।

কীভাবে জয় পেলেন মামদানি

বহু ধনী ও ইহুদি সম্প্রদায়ের বাসস্থান নিউইয়র্কে কীভাবে ইসরায়েল-বিরোধী ও চরম বামপন্থী একজন প্রার্থী জিতলেন?

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও যৌন হয়রানির অভিযোগ মামদানির জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি তাঁর প্রচারণায় ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যার ওপর জোর, যা ভোটারদের আকর্ষণ করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতিও বড় ভূমিকা রেখেছে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে তিনি নিয়মিত আকর্ষণীয় ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে এক ভিডিওতে তাঁকে নিউইয়র্ক ম্যারাথনে দৌড়াতে দেখা যায়, যেখানে তিনি আগের মেয়র এরিক অ্যাডামসের আমলে ভাড়াবৃদ্ধির সমালোচনা করেন।

তবে তাঁর সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সাংবাদিকরা উল্লেখ করেছেন তাঁর “শুনতে পারার বিরল প্রতিভা”। নিউইয়র্ক টাইমস জুলাই মাসে লিখেছিল, মামদানি এমন এক রাজনীতিক যিনি উত্তর দেওয়ার আগে চুপ থেকে ভেবে নেন, কখনো কখনো ২০ সেকেন্ডেরও বেশি সময় নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেন।

২০২৫ সালের প্রাইমারিতে জয়ের পর তিনি মতামত শুনতে শহরের প্রতিটি ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, বিশেষ করে যাঁরা তাঁকে বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর প্রচারণার ভাইরাল ভিডিওগুলোতেও দেখা যায়, তিনি রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, প্রশ্ন করছেন, আর মনোযোগ দিয়ে শুনছেন।

শ্রবণশীল রাজনীতি ও গণতন্ত্র

গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করা অনেক তাত্ত্বিকই মামদানির এই ধারা প্রশংসা করছেন। “Deliberative democracy” বা আলোচনা-ভিত্তিক গণতন্ত্রের ধারণা অনুযায়ী, ভোটের চেয়ে কথা বলা ও শুনতে পারা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।

এই ধারণা বলছে, রাজনীতিকদের উচিত শ্রদ্ধার সঙ্গে বিভিন্ন মতের মানুষের কথা শোনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তা বিবেচনা করা। এতে নীতি আরও উন্নত হয়, কারণ নেতৃত্ব তখন নিজের অনুভূতির ওপর নির্ভর না করে নানা যুক্তি ও অভিজ্ঞতা থেকে শেখে।

এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শ্রদ্ধাশীল রাজনীতি নাগরিকদের মধ্যে আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়ায়। এতে রাজনীতিবিদদের শুধু ক্ষমতালোভী নয়, বরং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যায়।

কৌশলগত কারণও রয়েছে

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মামদানির এই আচরণের পেছনে একটি কৌশলও আছে। নিউইয়র্ক সিটিতে ব্যবহৃত হয় “ranked choice voting” ব্যবস্থা, যেখানে ভোটাররা প্রার্থীদের পছন্দের ক্রমে সাজিয়ে ভোট দেন।

এ পদ্ধতিতে জয়ী হতে হলে প্রার্থীদের এমন নীতি নিতে হয় যা বেশিরভাগ মানুষের সমর্থন পায়। যেমন ধনীদের কর থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বিনামূল্যে শিশুযত্ন দেওয়া। এছাড়া এই পদ্ধতিতে প্রার্থীদের সব ধরনের রাজনৈতিক মতের মানুষের সঙ্গে শ্রদ্ধাপূর্ণ যোগাযোগ রাখতে হয়, যাতে দ্বিতীয় পছন্দের ভোটও পাওয়া যায়।

প্রখ্যাত গণতন্ত্রবিশেষজ্ঞ ল্যারি ডায়মন্ড এই ভোটব্যবস্থাকে বলেছেন “পরিবর্তনের আর্কিমিডিস লিভার”। তাঁর মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন কমাতে সহায়ক, কারণ এটি বিভাজনমূলক বক্তৃতা দেওয়া প্রার্থীদের শাস্তি দেয় এবং সংলাপ-নির্ভর রাজনীতিকে উৎসাহিত করে।

মার্কিন বাম রাজনীতির জন্য বার্তা

মামদানির বিজয় থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থীরা অনেক শিক্ষা নিতে পারে। এটি দেখিয়েছে যে একজন সমাজতান্ত্রিক ও ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থীও বড় নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন, যদি তিনি জীবনযাত্রার খরচ ও সাধারণ মানুষের সমস্যাকে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালান এবং ডিজিটাল মাধ্যমকে দক্ষভাবে ব্যবহার করেন।

এছাড়া তাঁর জয় প্রমাণ করে, যাঁদের ‘র‌্যাডিক্যাল’ মনে করা হয়, তাঁরা সফল হতে পারেন যদি তাঁরা দৃশ্যত মনোযোগ দিয়ে শুনতে ও আলোচনা করতে আগ্রহী হন।

মামদানির সাফল্য আরও ইঙ্গিত দেয় যে, ranked choice voting বা বিকল্প ভোটব্যবস্থা অন্য দেশেও রাজনৈতিক বিভাজন কমাতে কাজে লাগানো যেতে পারে। এটি ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের মেইন ও আলাস্কা রাজ্য, এবং সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

২০১১ সালে যুক্তরাজ্যেও এই ভোটব্যবস্থা চালুর বিষয়ে গণভোট হয়েছিল, যদিও তা প্রত্যাখ্যাত হয়।

শেষ পর্যন্ত মামদানির বিজয় দেখিয়েছে, র‌্যাডিক্যাল ভাবনা ও চিন্তাশীলতা একসঙ্গে চলতে পারে। বিকল্প ভোটব্যবস্থা এমন রাজনীতিকে উৎসাহ দেয় যা শ্রদ্ধাশীল ও আলোচনাভিত্তিক। যদিও কেউ কেউ বলে, এতে রাজনীতি নীরস হয়ে পড়ে, কিন্তু মামদানি প্রমাণ করেছেন তা ভুল।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার এমন রাজনীতি গড়ে তুলতে পারে যেখানে আলোচনা, শ্রবণশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়বে। বিভাজনের বদলে সংলাপ, ক্ষমতার বদলে অংশগ্রহণই হবে গণতন্ত্রের নতুন চেতনা।

Source: The Conversation

এই শাখার আরও খবর

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ঝরল ১০ প্রাণ, আহত আরও ২০

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: নাটোরের বড়াইগ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ। যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন।…

‘আমি ভয় পাই না’, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা আবারও বললেন শেখ হাসিনা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে পারেন বলে…

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানত না সরকার

সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া ও অভিযোগের বিস্তারিত জানতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের দূতাবাস বা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au