বাংলাদেশ

লক্ষ্মীপুর মুক্তির গৌরবগাঁথা: ৪ ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ

  • 6:17 am - December 04, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২২৭ বার
লক্ষ্মীপুর সদরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। শহরের মাদাম এলাকায়. ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৪ ডিসেম্বর- লক্ষ্মীপুরের ইতিহাসে ৪ ডিসেম্বর এক গৌরবময় ও আবেগভরা দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের টানা অভিযান আর চাপ সহ্য করতে না পেরে রাতের অন্ধকারে কৌশলে পালিয়ে যায়। পরদিন সকালে মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই লক্ষ্মীপুর সদরের মানুষ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। দীর্ঘ নয় মাসের দখলদারিত্বের অবসান ঘটে।

শুরুর প্রতিরোধ ও কৌশলগত সাফল্য

লক্ষ্মীপুরে পাকিস্তানবিরোধী প্রতিরোধ শুরু হয় এপ্রিলেই। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ’ অনুযায়ী, শত্রু যাতে সহজে সদর এলাকায় ঢুকতে না পারে, সে জন্য চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর সদর পর্যন্ত প্রধান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ব্রিজ ভেঙে দেয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় স্বাধীনতাকামী মানুষ। মাদাম ব্রিজ, মন্দারী বাজার ব্রিজ ও চন্দ্রগঞ্জ পশ্চিম বাজার ব্রিজ ভেঙে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানি বাহিনীকে অগ্রযাত্রায় বিপাকে ফেলে। এখনও মাদাম ব্রিজের ভাঙা পিলার সেই স্মৃতি ধরে রেখেছে।

দখল, গণহত্যা ও সাব ক্যাম্প

২৫ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা লক্ষ্মীপুর সদরে ঢোকার পর বাজারডিতে সার্কেল অফিসারের কার্যালয়কে প্রধান ক্যাম্প বানায়। একই দিন মজপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে ৩৫ জনকে হত্যা করে। এই ঘটনা ইতিহাসে ‘মজপুর গণহত্যা’ নামে পরিচিত। পরে তারা দালাল বাজার হাইস্কুল, মান্দারী হাইস্কুল, বটু চৌধুরীর বাড়ি, পুরাতন হাইস্কুল, বড় মসজিদ, পেয়ারাপুর, আলমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সাব ক্যাম্প গড়ে তোলে।

লক্ষ্মীপুরের সম্মুখযুদ্ধ

মুক্তিযোদ্ধারা এখানকার প্রতিটি এলাকায় আক্রমণাত্মক ও সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, শুধু এই জেলায়ই ১৭টি বড় সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দালাল বাজার রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন, মান্দারী ক্যাম্প আক্রমণ, প্রতাপগঞ্জ হাইস্কুল আক্রমণ ও বড়ালিয়া অপারেশন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

পাকিস্তানি বাহিনীর পলায়ন

নভেম্বরের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ আরও তীব্র হয়। সেই সময়ের স্মৃতিচারণায় মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম ও খোরশেদ আলম পাটোয়ারী জানান, পাকিস্তানি বাহিনী তখন ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল। তাদের চলাচল সীমিত হয়ে আসে। ২ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা রফিকুল হায়দার চৌধুরী, আক্তারুজ্জামান ও সুবেদার আবদুল মতিনের নেতৃত্বে মাদাম ও থানার দুই ক্যাম্প ঘিরে ফেলেন। ৩ ডিসেম্বর ভোরে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলে পাকিস্তানি সেনারা তা প্রত্যাখ্যান করে। শুরু হয় টানা লড়াই।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা গুলিবর্ষণ, মর্টার হামলা, আর দিগন্তজোড়া ধোঁয়া তখন লক্ষ্মীপুরের আকাশ ঢেকে ফেলেছিল।

সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ

বিকেলের দিকে এক অনন্য দৃশ্য দেখা যায়। হাজারো মানুষ হাতে লাঠি, বাঁশ, কাস্তে, দা যা পেয়েছেন তা নিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে রাস্তায় নেমে আসেন। মনে হচ্ছিল আর কোনো শক্তিই বিজয় ঠেকাতে পারবে না।

বিজয়ের সকাল

৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকারদের রেখে পালিয়ে যায় চৌমুহনীর দিকে। ৪ ডিসেম্বর সকালে খবর ছড়িয়ে পড়তেই শহরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। মানুষের চোখে সেইদিন ছিল স্বাধীনতার প্রথম আলো।

বিজয়ের সাথে বেদনার গল্প

বিজয়ের উৎসবের মধ্যেও ঘটে এক বেদনাদায়ক ঘটনা। রাজাকার কমান্ডার আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিত হামলা হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ শহীদ হন, আহত হন আরও তিনজন।

এভাবেই যুদ্ধ, ত্যাগ, আনন্দ আর বেদনার মিশেলে লেখা হয় লক্ষ্মীপুর মুক্ত হওয়ার ইতিহাস।

এই শাখার আরও খবর

শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুন, আতঙ্কে বিদেশগামী যাত্রীরা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)…

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au