সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী
দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…
মেলবোর্ন, ২০ এপ্রিল- একসময় ‘ভাগ্যবান দেশ’ হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়া এখন ক্রমেই সেই পরিচয়ের ভার ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত জরিপে উঠে এসেছে, দেশটির মানুষের জীবনে সন্তুষ্টি কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সমাজে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা ও হতাশা।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পরিচালিত এই জরিপে ৩ হাজার ৬৬২ জন অংশগ্রহণ করেন। মার্চ মাসে পরিচালিত এই জরিপের ফলাফল বলছে, অস্ট্রেলিয়ার মানুষ এখন তাদের জীবন নিয়ে এতটাই অসন্তুষ্ট যে, এমনকি কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার লকডাউন পরিস্থিতিকেও তারা তুলনামূলকভাবে কম চাপপূর্ণ বলে মনে করছেন।
বিষয়টি গবেষকদের কাছেও বিস্ময়কর, কারণ সেই সময় দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি থাকা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মানুষের মানসিক অবস্থাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে আর্থিক চাপ ও বৈশ্বিক অস্থিরতা সেই সময়ের চাপকেও ছাড়িয়ে গেছে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক নিকোলাস বিডল বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারি অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন এনেছে। তবে বর্তমানে যে বৈশ্বিক সংঘাত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা একই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও গভীরভাবে।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালির বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিকে সরাসরি চাপে ফেলেছে। জ্বালানি খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।

জরিপে প্রথমবারের মতো দেখা গেছে, দেশের দিকনির্দেশনা নিয়ে সন্তুষ্ট মানুষের তুলনায় অসন্তুষ্ট মানুষের সংখ্যা বেশি। এটি অস্ট্রেলিয়ার মতো স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ৫০ বছর আগে জীবনযাত্রা ভালো ছিল এবং আগামী ৫০ বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমান নিয়েও হতাশা বেড়েছে। ২০০৮ সালে যেখানে বর্তমান শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক ধারণার ব্যবধান ছিল ১৯ শতাংশ, সেখানে এখন তা বেড়ে ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই হতাশার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, বর্তমান আয়ে জীবনধারণ করা তাদের জন্য কঠিন বা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে চাকরি হারানোর ভয়ও বেড়েছে। প্রায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা চাকরি হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই হারটি কোভিড-১৯ সময়ের সমান হলেও বর্তমানে বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম, যা মানুষের মানসিক উদ্বেগের গভীরতাকেই নির্দেশ করে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।ছবিঃ সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে এই চাপের পেছনে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির বড় ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত শুধু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাই তৈরি করেনি, বরং বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, যার প্রভাব পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের ওপর। ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খরচ, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়েছে। আগামী বাজেট সামনে রেখে অর্থমন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকরা বিকল্প পরিকল্পনা খুঁজছেন। যদি জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তবে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প উৎপাদন এবং জরুরি পরিষেবাগুলো কীভাবে সচল রাখা যাবে, তা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে। সরকার এমন এক ‘চাপমুক্তির পথ’ খুঁজছে, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা লাঘব করা যায়।
তবে এই চাপ মোকাবিলায় সরকারের সামনে সহজ কোনো পথ নেই। সাধারণ সময়ে বাজেট ঘাটতি কমাতে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় কমানো একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারত। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা চুক্তি বজায় রাখা অস্ট্রেলিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রতিরক্ষা খাতে কাটছাঁটের সুযোগ খুব সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের দৃষ্টি পড়েছে বড় ব্যয়বহুল সামাজিক কর্মসূচিগুলোর দিকে, বিশেষ করে ন্যাশনাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনস্যুরেন্স স্কিম বা এনডিআইএস-এর ওপর। এই কর্মসূচিটি প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা ব্যবস্থা, যা দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, এই কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থন কমছে।
তথ্য অনুযায়ী, যেখানে ৭৯ শতাংশ অস্ট্রেলীয় মনে করেন মেডিকেয়ার সেবা ভালো বা অত্যন্ত ভালো, সেখানে মাত্র ৪২ শতাংশ মনে করেন এনডিআইএস অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করছে। প্রায় ৬১ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এই কর্মসূচি বর্তমানে ত্রুটিপূর্ণ এবং ব্যয় অত্যধিক। ফলে সরকার এখন এই কর্মসূচির ব্যয় ও কাঠামো পুনর্বিবেচনার পরিকল্পনা করছে।
চলতি বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৭ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে, যা প্রাথমিক পরিকল্পনার তুলনায় অনেক বেশি। ২০১১ সালে যেখানে এই কর্মসূচির আওতায় ৪ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কথা ভাবা হয়েছিল, সেখানে বর্তমানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গেছে। ফলে ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে অর্থনৈতিক চাপ কমানো, অন্যদিকে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনতে গেলে জনগণের একাংশ ক্ষুব্ধ হতে পারে, আবার পরিবর্তন না আনলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au