বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

সবচেয়ে দয়ালু মানুষরাই কেন একা থাকেন, কি বলছে গবেষণা

  • 6:23 pm - April 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৪৫ বার
একাকিত্ব। প্রতিকী ছবি

মেলবোর্ন, ২২ এপ্রিল- মনোবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরছে। সবচেয়ে দয়ালু ও সহানুভূতিশীল মানুষরাই সবসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাঝে থাকেন না। তারা অন্যদের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকেন, সাহায্য করেন, বোঝার চেষ্টা করেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিজেরা ততটা বোঝাপড়া বা ঘনিষ্ঠতা পান না। ফলে বাইরে থেকে যতটা সংযুক্ত মনে হয়, ভেতরে ভেতরে তারা একাকীত্ব অনুভব করতে পারেন।

মানুষ সাধারণত মনে করে, যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল, যত্নশীল এবং অন্যের পাশে দাঁড়াতে সবসময় প্রস্তুত, তার চারপাশেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ভিড় থাকার কথা। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বাস্তবে অনেক সময় এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। যারা অন্যের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকেন, সাহায্য করতে এগিয়ে যান, অন্যের অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করেন তাদের মধ্যেই অনেককে দেখা যায় একাকীত্বের মধ্যে থাকতে। তারা অন্যদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিজেরা ততটা বোঝা বা উপলব্ধি করা হন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধুত্ব বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শুধু দয়ালু হওয়া বা সহানুভূতিশীল আচরণের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত, যেমন পারস্পরিক বোঝাপড়া, ধীরে ধীরে নিজেকে উন্মুক্ত করা, নিজের আসল সত্তাকে প্রকাশ করা এবং একে অপরের কাছ থেকে সমানভাবে সহযোগিতা পাওয়া। এই উপাদানগুলোর ভারসাম্য না থাকলে, একজন ভালো মনের মানুষও বন্ধুত্বের পরিধির বাইরে পড়ে যেতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকেই যখন কোনো বন্ধু সমস্যার কথা বলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে উদ্দেশ্য ভালো থাকলেও, অনেক সময় এতে সমস্যাটি শোনা বা বোঝার জায়গাটি হারিয়ে যায়। মানুষ সাধারণত চায় তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হোক, কেউ তার কথা মন দিয়ে শুনুক। কেউ যদি শুধু উপদেশ দেয়, তাহলে সে হয়তো সাহায্য করতে চাইছে, কিন্তু অন্য ব্যক্তি মনে করতে পারেন তাকে ঠিকভাবে বোঝা হয়নি। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কারও অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়া—যেমন “তুমি কষ্টে আছো মনে হচ্ছে” এ ধরনের প্রতিক্রিয়া সম্পর্ককে আরও গভীর করতে সাহায্য করে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো বিশ্বাস গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া। অনেক সময় কিছু মানুষ খুব দ্রুত নিজের ব্যক্তিগত বা গভীর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ফেলেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাস ধীরে ধীরে তৈরি হয়। একসঙ্গে কথোপকথনের মধ্যে দুজন মানুষ ধাপে ধাপে নিজেদের খুলে ধরলে সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে এগোয়। একপাক্ষিকভাবে খুব দ্রুত সবকিছু বলে ফেলা অনেক সময় অন্যজনকে অস্বস্তিতে ফেলে এবং সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

এছাড়া অতিরিক্ত সাহায্য করার প্রবণতাও একটি বড় কারণ। অনেক দয়ালু মানুষ এমন অবস্থায় পৌঁছান, যেখানে তারা সবসময় অন্যদের জন্য প্রস্তুত থাকেন যেকোনো প্রয়োজনে এগিয়ে যান, নিজের সময় বা শক্তির কথা না ভেবে ‘না’ বলতে পারেন না। এতে বাইরে থেকে উদারতা মনে হলেও, ধীরে ধীরে সম্পর্ক একপাক্ষিক হয়ে যেতে পারে। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে পারস্পরিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন যদি শুধু দিয়ে যান আর অন্যজন যদি শুধু গ্রহণ করেন, তাহলে সেই সম্পর্ক গভীর হওয়ার বদলে ব্যবহারিক হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, অনেকেই নিজের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে গিয়ে নিজের আসল চিন্তা বা অনুভূতি প্রকাশ করেন না। তারা অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য নিজের মতামত লুকিয়ে রাখেন, এমনকি নিজের পছন্দ-অপছন্দও গোপন করেন। এতে তারা সবার কাছে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত থাকেন ঠিকই, কিন্তু কেউ তাদের প্রকৃত সত্তাকে জানতে পারেন না। ফলে সম্পর্কগুলো উপরিভাগেই থেকে যায়, গভীরে পৌঁছায় না।

এছাড়া দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতাও সম্পর্ককে দুর্বল করে। একটি সুস্থ বন্ধুত্ব মানে সবসময় একমত থাকা নয়, বরং প্রয়োজন হলে সত্য কথা বলা এবং সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা। ছোটখাটো মতবিরোধও যদি এড়িয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সম্পর্ক কখনোই দৃঢ় ভিত্তি পায় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, অনেক দয়ালু মানুষ নিজের কষ্টের সময় অন্যদের থেকে দূরে সরে যান। তারা মনে করেন, নিজের সমস্যা শেয়ার করলে অন্যদের ওপর চাপ পড়বে বা তারা দুর্বল হিসেবে দেখা দেবেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, মানুষ সাধারণত সাহায্য করতে আগ্রহী থাকে এবং কাউকে সাহায্য করতে পারলে ইতিবাচক অনুভূতি পায়। তাই সাহায্য চাওয়াও বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গবেষণার সারসংক্ষেপ বলছে, বন্ধুত্ব শুধু অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের জন্যও অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হয়। একজন মানুষ যতই দয়ালু বা সহানুভূতিশীল হোন না কেন, যদি তিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ না করেন, সীমা নির্ধারণ না করেন এবং সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় না রাখেন, তাহলে তিনি সহজেই একাকীত্বে ভুগতে পারেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তখনই, যখন দুই পক্ষই একে অপরকে বুঝতে চেষ্টা করে, নিজেদের খুলে ধরে এবং একে অপরের জীবনে সমানভাবে উপস্থিত থাকে।

মূল গবেষণাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

এই শাখার আরও খবর

হুথিদের হামলায় সৌদির দুই বিমানবন্দরে নিহত ৩, আহত ৩৬

সৌদি আরবের দুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠী। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং…

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে ভারতের গোয়ার ডোনা পাওলায় নিজ বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে মারা যান…

রোহিঙ্গা সহায়তায় ব্র্যাকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ১৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে অস্ট্রেলিয়া। এ লক্ষ্যে ব্র্যাকের সঙ্গে ১৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের (প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা) নতুন একটি…

বিদেশি সহায়তা কমায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ২ হাজারের বেশি এনজিও

বিদেশি অনুদান কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দুই হাজারের বেশি ছোট ও মাঝারি আকারের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য…

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতায় বিএনপি, শেখ হাসিনাকে কি গৃহবন্দী করা হবে?

বাংলাদেশের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া ‘খারাপ কোনো ধারণা নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে…

মোদির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলার মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au