বাংলাদেশ

ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ নয়, সম্প্রীতিই হোক মানবতার ধর্ম

সরদার সেলিম রেজা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

  • 4:54 pm - July 31, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৭০ বার
সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩১ জুলাই: আজ বিশ্বের দিকে তাকালে শুধু রক্ত আর বারুদের গন্ধ পাই। টেলিভিশন খুললেই দেখি শিশুর লাশ, বিধবা মায়ের কান্না, ধ্বংসস্তূপ। আর কারণ হিসেবে বারবার আসে একটি শব্দ – ধর্ম।

অথচ পৃথিবীর সব ধর্মের মূল বাণী এক। ইসলাম বলে “মানুষ সেবা”, সনাতন বলে “বসুধৈব কুটুম্বকম”, খ্রিস্টান বলে “মানুষকে ভালোবাসো”, বৌদ্ধ বলে “অহিংসা পরম ধর্ম”।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা ধর্মে না, সমস্যা ধর্মকে ব্যবহারকারীদের মধ্যে।

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা গোপালগঞ্জের বাবুরগাতী গ্রামের পাশেই রঘুনাথপুর – একটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম।

ছোটবেলা থেকে দেখেছি – ঈদের দিন বা বিয়ে সাদী বা অন্য কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে ওরা ঘনিষ্ঠজনদের বাড়িতে আসে । দুর্গাপূজায় আমরা তাদের প্যান্ডেলে যাই। কেউ কখনো জিজ্ঞেস করেনি “তুমি কোন ধর্মের”।

কারণ আমরা জানতাম আমরা আগে মানুষ, তারপর ধর্ম।

সব ধর্মের মানুষের এক ধর্মের অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান থাকা উচিত।
তারপর সারা বিশ্বে ধর্মের কারণে মানুষ মারছে। নিচে উদাহরণ দেওয়া হলো: ২০২৪-২৫ সালের পরিসংখ্যান যা দেখা যাচ্ছে –
গাজা উপত্যকা: ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত। এর মধ্যে ১৭ হাজার শিশু।
মিয়ানমার: রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর গণহত্যা। ১২ লাখ মানুষ শরণার্থী।
সুদান: গৃহযুদ্ধে ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বাস্তুহারা।

আবার অন্যদিকে নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ভারতের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সহিংসতায় প্রতি সপ্তাহে মানুষ মরছে।

জাতিসংঘের রিপোর্ট বলছে – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে ১ জন শিশু সশস্ত্র সংঘাতে মারা যাচ্ছে।

মানুষ মারছে, নারী শিশু মরছে, কাঁদছে।
আবার দিল্লীতে ছাতা, রঘুনাথপুরে হাতপাখা।
আমরা কোন পথ বেছে নেবো?

ইতিহাস আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছে। মধ্যযুগের ক্রুসেড, ১৯৪৭ এর দাঙ্গা, বসনিয়ার গণহত্যা – সব কিছুর পেছনে ধর্মকে সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু লাভ কী হয়েছে? শুধু লাশের স্তূপ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের সংবিধানে “ধর্মনিরপেক্ষতা” নীতি রেখেছিলেন। তিনি বলতেন – “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”।
ধর্মের কারণে বিভেদ বিতর্ক সৃষ্টি যেন আর না হয়।
আমরা সবাই একই আকাশের নিচে থাকি। একই নদীর পানি খাই। একই মাটিতে কবর হয়। তাহলে বিভেদ কিসের?

আমরা এখন পাথর হয়ে গেছি। মোবাইলে যুদ্ধের ভিডিও দেখি। ৫ সেকেন্ড দেখে “Sad” রিয়্যাক্ট দিয়ে স্ক্রল করে চলে যাই।

তারপরও মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা উদাহরণ সৃষ্টি করে । সম্প্রতি ঘটনা খবরের মাধ্যমে যা দেখা গেলো দিল্লীর রাস্তায় মুসলিম নামাজ পড়ছে আর একজন হিন্দু সধক হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে। এ দৃশ্য দেখে কোটি কোটি মানুষের মন ছুয়ে গেছে।

মানবতা বিবেক জাগাতে হবে। মনুষ্যত্ব বিকাশ করতে হবে। সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।

কীভাবে? শিক্ষা ব্যবস্থায় সব ধর্মের মূল্যবোধ, ধর্মীয় নেতাদের শান্তির বাণী, পরিবারে “ও আমার বন্ধু” শিক্ষা, আর মিডিয়ায় সম্প্রীতির খবর।

আমরা গর্ব করে বলতে পারি – বাংলাদেশ পারে।
১৯৭১ সালে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছি।
২০২০ সালে করোনার সময় মসজিদের ইমাম আর মন্দিরের পুরোহিত একসাথে ত্রাণ বিতরণ করেছে।
প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজায় মুসলিম যুবকরা স্বেচ্ছায় পাহারা দেয়। ঈদে হিন্দু ভাইরা নিরাপত্তা দেয়।
এই বাংলাদেশই বিশ্বকে দেখাতে পারে – বহুত্ববাদ মানে দুর্বলতা না, এটা শক্তি।

তাই এভাবে আমি বলি:

আজানের ধ্বনি ভেসে আসে,
শঙ্খের আওয়াজ ওঠে।
গির্জার ঘন্টা বাজে দূরে,
প্রার্থনা একই স্রষ্টার পথে।

তরবারি নয়, বই হাতে নাও,
ঘৃণা নয়, বুকে বুক মেলাও।
ধর্ম থাকুক অন্তরের গভীরে,
মানবতা থাকুক সবার উপরে।

আমাদের ৫টি শপথ নিতে হবে
১. শ্রদ্ধার শপথ: অন্য ধর্মের উপাসনালয়, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় ব্যক্তিকে নিজ ধর্মের মতো সম্মান করবো।
২. সংলাপের শপথ: মতপার্থক্য হলে রাস্তায় না, আলোচনার টেবিলে সমাধান করবো।
৩. মানবতার শপথ: বন্যা, দুর্যোগ, অসুস্থতায় ধর্ম জিজ্ঞেস না করে মানুষকে সাহায্য করবো।
৪. শিক্ষার শপথ: নিজের সন্তানকে “ওরা খারাপ” না শিখিয়ে “সবাই মানুষ” শেখাবো।
৫. প্রতিবাদের শপথ: ধর্মের নামে কোনো সহিংসতা আর নয়।

শেষ কথা: ধর্ম থাকুক, যুদ্ধ না
ভাইয়েরা, বোনেরা, আর কত?

আর কত মায়ের কোল খালি হবে? আর কত শিশু এতিম হবে? আর কত রক্ত ঝরলে আমরা বুঝবো?

সারা বিশ্বে ধর্ম নিয়ে এখন বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে। যুদ্ধ হচ্ছে।
কিন্তু দিল্লীর হাতপাখা প্রমাণ করেছে – মানুষ চাইলে এখনো মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে।

আসুন আমরা সবাই একসাথে বলি – “আমার ধর্ম আমাকে মানুষ হতে শিখিয়েছে। তাই আমি সব মানুষকে ভালোবাসি”।

মসজিদ থাকুক ইবাদতের জন্য। মন্দির থাকুক প্রার্থনার জন্য। গির্জা থাকুক উপাসনার জন্য। আর রাস্তা, স্কুল, অফিস, বাজার থাকুক শুধু মানুষের জন্য।

ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ নয়, সম্প্রীতিই হোক মানবতার ধর্ম।
মানবতাই হোক আমাদের একমাত্র ধর্ম।

এই শাখার আরও খবর

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল দেশ, কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি

ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষক, অভিভাবক ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের…

আর্জেন্টিনার জয়, গোল-অ্যাসিস্টে বিদায় রাঙালেন মেসি

জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচটাও স্মরণীয় করে রাখলেন লিওনেল মেসি। বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে জয় দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় শেষ করেছে…

অভিবাসন কমানোর পরিকল্পনায় প্রবীণসেবা কর্মীরাও ঝুঁকিতে

অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী জোটের প্রস্তাবিত অভিবাসন কমানোর পরিকল্পনায় দেশটির প্রবীণসেবা খাতে কর্মরত কিছু কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে স্বীকার করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর। একই সঙ্গে…

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন কমাতে তিন দলের তিন পরিকল্পনা

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতি নিয়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি, বিরোধী লিবারেল-ন্যাশনাল জোট এবং ওয়ান নেশন পার্টির মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। তিন দলই বর্তমানের তুলনায় অভিবাসন…

ভেনিস বিয়েনালে মেন্টরশিপে বাংলাদেশি শিল্পী মিতা চৌধুরী

অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেনিস বিয়েনালে মেন্টরশিপ কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আন্তঃবিষয়ক শিল্পী মিতা চৌধুরী। ২০২৬ সালের এই বিশেষ মেন্টরশিপের জন্য তাকে নির্বাচিত করেছে…

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতে যা যা ঘটছে

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভ সমাবেশে অভিযান চালিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বেশ কয়েকজন বিরোধী আইনপ্রণেতাকে আটক করেছে দিল্লি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au