সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী
দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…
মেলবোর্ন, ১২ আগষ্ট: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাড়তে থাকা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগ দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঢাকাভিত্তিক সংবাদপত্র প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কম।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেও দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যেই ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ভারত–চীন দুই দেশের সঙ্গেই ভারসাম্যের চেষ্টা
চলতি বছরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন। এরপর চীন সফরে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলসে বৈঠক করেন।
বাংলাদেশের নেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবেই ভারত, চীন ও সৌদি আরবসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রবণতা দেখা যায়। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বিদেশ সফরগুলোতেও এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে জোটটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ঢাকা। বর্তমানে বাংলাদেশ আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।
এ অবস্থায় ভারত ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এই সেশনে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি আমন্ত্রিত দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে বহুপাক্ষিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ থাকে।
সম্মেলনে যোগ দিলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গেও বৈঠকের সুযোগ পেতেন তারেক রহমান। ফলে বাংলাদেশের জন্য সম্মেলনটি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা
এদিকে ভারতের মাটি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
গত ৫ আগস্ট দুই বছর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ওই বক্তব্যে তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের মাসে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথাও জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে তারেক রহমানের সরকার। একই সঙ্গে ভারত তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও ঢাকার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
দিল্লির আয়োজন নিয়ে ঢাকার অসন্তোষ
৫ আগস্টের ওই ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানের বিষয়ে ভারত জানিয়েছিল, এটি স্বাধীনভাবে আয়োজন করা হয়েছিল এবং ভারত সরকার এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল না। তবে অনুষ্ঠানটি ভারতের মাটি থেকে সরাসরি সম্প্রচার হওয়ায় ঢাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই ঘটনাকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা হিসেবে বর্ণনা করে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি এটি অসম্মান এবং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর বলেও অভিযোগ করা হয়।
এর পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের ফেরত পাঠানোর বিষয়েও দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান জানিয়েছেন।
অনিশ্চিত তারেকের দিল্লি সফর
সাম্প্রতিক এসব ঘটনাপ্রবাহের কারণে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যখন কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ছে, তখন তারেক রহমানকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্পর্কের উন্নয়নের একটি সুযোগ তৈরি করেছিল নয়াদিল্লি। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই উদ্যোগকে জটিল করে তুলেছে।
তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত সম্মেলনে যোগ দেন কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পরিস্থিতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্যুতে দুই দেশের কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au