বিশ্ব

ইরান-ট্রাম্প দ্বন্দ্ব কি ব্যক্তিগত পর্যায়ে? নিজের মৃত্যুভয় নিয়ে যা বললেন ট্রাম্প

  • 2:33 am - August 13, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৬৪ বার
গত ৮ জুলাই ইংল্যান্ডের মিলডেনহলে পৌঁছানোর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজ থেকে নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে।ছবি: রয়টার্স

মেলবোর্ন, ১৩ আগস্ট: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা এবং তাঁকে হত্যার হুমকির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এমনকি ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ট্রাম্পকে রক্ষায় তাঁর যাতায়াতের ক্ষেত্রেও গোপন নিরাপত্তা কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পরদিন এবিসি নিউজের সাংবাদিক জোনাথন কার্লের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সেআমাকেআঘাতকরারআগেইআমিতাকেআঘাতকরেছি।’ তাঁর দাবি ছিল, ইরান এর আগে দুবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।

ওই অভিযানের প্রথম দিনই ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।

ট্রাম্প এসব হামলার সঙ্গে অতীতে তাঁকে দেওয়া ইরানি হুমকি ও কথিত হত্যাচেষ্টার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেছেন।

এয়ারফোর্স ওয়ান নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ

যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় পাঁচ মাসে ট্রাম্প নিজে এ বিষয়ে খুব বেশি মন্তব্য না করলেও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একই ধরনের দাবি করেছেন। গত মার্চে হেগসেথ বলেছিলেন, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পই জয়ী হয়েছেন।

এদিকে গত মাসে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে নেওয়া একটি বিশেষ কৌশলের খবর সামনে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় ট্রাম্প প্রথমে তাঁর জন্য নির্ধারিত উড়োজাহাজে ওঠেন। পরে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি গোপনে সেটি থেকে নেমে বিকল্প একটি উড়োজাহাজে চলে যান। এ সময় তাঁকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের মাধ্যমে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গণমাধ্যমকর্মী ও হোয়াইট হাউসের অধিকাংশ কর্মী বিষয়টি জানতে পারেননি। তাঁরা প্রেসিডেন্টের সরকারি এয়ারফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজেই দেশে ফেরেন। ফলে সেটি সম্ভাব্য হামলাকারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য একটি ‘ডিকয়’ বা প্রতারণামূলক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে এয়ারফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য ছিল বলেই এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তবে হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

প্রেসিডেন্টের জন্য এমন নিরাপত্তা কতটা অস্বাভাবিক?

সরকারি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্র বা যুদ্ধের কাছাকাছি এলাকায় কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভ্রমণ করলে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।

অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা আফগানিস্তান, ইরাক ও ইউক্রেনের মতো দেশে গোপনীয়তা বজায় রেখে সফর করেছেন। তবে সাধারণত সফরের বিষয়ে গণমাধ্যমকে কিছুটা আগাম জানানো হতো এবং সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়ে সমঝোতা থাকত।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে একটি উড়োজাহাজ থেকে গোপনে নেমে ক্যাটারিং ট্রাকের মাধ্যমে অন্য উড়োজাহাজে যাওয়ার ঘটনা তাই আলাদা করে নজর কেড়েছে।

প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাতে ট্রাম্প নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরেছেন এবং ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য ইরানি হামলার আশঙ্কায় তাঁকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা তাঁর শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকে।

ট্রাম্পকে ঘিরে আগেও ছিল হত্যার হুমকি

ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি নতুন নয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার জন্য মার্কিন হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর ইরানের নেতারা ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।

এরপর ২০২২ সালে ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনার তথ্য সামনে আসে। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য না করার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।

২০২৪ সালে পাকিস্তানি নাগরিক আসিফ মার্চেন্টকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তাঁর বিরুদ্ধে ইরানের আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার এবং ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। একই বছর আফগান নাগরিক ফারহাদ শাকেরির বিরুদ্ধেও ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়।

গত ৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারার এসেনবোগা বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের আগে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজের পাশে ক্যাটারিং ট্রাককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।ছবি: এএফপি

মার্চেন্ট ২০২৬ সালের মার্চে দোষী সাব্যস্ত হন, আর শাকেরি এখনো পলাতক বলে মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি।

নির্বাচনী প্রচারেও হত্যাচেষ্টার মুখে ট্রাম্প

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার আশঙ্কা শুধু ইরানকেন্দ্রিক নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে নির্বাচনী সমাবেশে এক বন্দুকধারীর গুলিতে তিনি আহত হন। তাঁর মুখে রক্তও দেখা যায়।

এর দুই মাস পর ফ্লোরিডায় ট্রাম্প গলফ খেলার সময় কাছাকাছি এলাকায় গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক সশস্ত্র ব্যক্তিকে সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা গ্রেপ্তার করেন।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সেমাফরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রায়ই নিজেকে হত্যাচেষ্টার সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে দেখেন এবং এ নিয়ে রসিকতাও করেন।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ট্রাম্পের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়া যে এতটা বিপজ্জনক, তা আগে জানলে হয়তো তিনি নির্বাচনে প্রার্থীই হতেন না। তবে ওই কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প সাধারণত এ ধরনের কথা রসিকতার সুরেই বলেন, যদিও এর পেছনে বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে।

ইরানের নতুন হুমকি

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলা এবং পরবর্তী সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সংঘাত আরও গভীর হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্প নিজেও ইরানের কাছ থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার দাবি করেছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে প্রকাশিত ছবির স্ক্রিনশট

জুলাইয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ইরান তাঁকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করার হুমকি দিয়েছে। এর জবাবে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার হুমকিও দেন।

এদিকে তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের ফেরার আগের দিন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া কিছু মানুষের হাতে ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বানসংবলিত ব্যানার দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এরপর তেহরানের একটি চত্বরে একটি ভবনের দেয়ালে ট্রাম্পকে কালো কফিনে শায়িত অবস্থায় দেখিয়ে একটি বড় ম্যুরাল আঁকা হয়। সেখানে ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান এবং প্রতিশোধের বার্তা লেখা ছিল।

তবে অতীতে ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ইরান সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ট্রাম্পের মুখে মৃত্যুভয়ের কথা

তুরস্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার শেষ পর্যায়ে ট্রাম্প ও তাঁর সফরসঙ্গী সাংবাদিকেরা আবার একই উড়োজাহাজে ওঠেন। তখন সাংবাদিকেরা তাঁর অস্বাভাবিক যাত্রা সম্পর্কে জানতে চান।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি নিয়মিত সংবাদে দেখেন যে হত্যার তালিকায় তাঁকে এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রাখা হয়েছে।এরপর রসিকতার সুরে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন,‘তবেআমিযদিমারাযাই, তাহলেআপনারাওযাবেন, তাইনা?’

ট্রাম্পের এই মন্তব্য এবং তাঁর নিরাপত্তার জন্য নেওয়া সাম্প্রতিক গোপন কৌশল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এখন শুধু রাষ্ট্রীয় বা সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশের সংঘাতের একটি ব্যক্তিগত মাত্রাও তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সূত্র-বিবিসি নিউজ

এই শাখার আরও খবর

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au