রংপুরের চার খুন: অমীমাংসিত প্রশ্ন
একটি তালাবদ্ধ বাড়ি। কয়েক দিন ধরে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। এক পর্যায়ে আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সন্দেহ হয় প্রতিবেশীদের। পুলিশ এসে তালা ভাঙার পর…
মেলবোর্ন, ২৩ আগষ্ট- সরকারের প্রথম ছয় মাসে বাজার ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো স্বস্তি ফেরেনি। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতিও নেমে এসেছে। তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে চাল, ডিম, মুরগি, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। গত আট মাসের মধ্যে জুলাইয়ের সার্বিক মূল্যস্ফীতিই ছিল সর্বনিম্ন।
তবে মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের বছরের তুলনায় পণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে কাগজে-কলমে স্বস্তির পরিসংখ্যান দেখা গেলেও বাস্তব বাজারে তার প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না।
রাজধানীর বাজারে বর্তমানে ডিমের এক ডজন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির কেজি প্রায় ১৯০ টাকা। মিনিকেট চালের দাম ৭৮ টাকা এবং কাটারি নাজির চালের দাম ৮৫ টাকা কেজি। বিভিন্ন ধরনের সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে বাজার নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার, নিয়মিত অভিযান, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) ডিজিটাল করা, স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ২০২৬ প্রণয়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশের রপ্তানি খাতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ২০২টি গন্তব্যে ৮১২ ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও পাটজাত পণ্যকে নতুন রপ্তানি খাত হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ ছাড়া জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগও রয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেল, ডিম, মুরগি ও সবজির দাম মানুষের নাগালের মধ্যে আনা না গেলে অন্যান্য অর্জনের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে খুব বেশি দৃশ্যমান হবে না।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ১৮ আগস্ট ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তবে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সরকার দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, পণ্যের দাম কমাতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ঋণের সুদ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন ও অবকাঠামোর উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাজারে অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সরবরাহ সংকট, অপচয় এবং বাজারে তথ্যের ঘাটতিও পণ্যের দাম বাড়ার বড় কারণ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন পণ্যের দামে বড় ব্যবধান রয়েছে। কাঁচামরিচের দাম এই পর্যায়ে ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। মাঝারি চালের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান প্রায় ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, মসুর ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ।
কাঁচামরিচ, চাল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে পরিবহন, সংরক্ষণ, মধ্যস্বত্বভোগী, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহের বিভিন্ন স্তর যুক্ত হয়। এসব কারণেই অনেক সময় কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হয়।
বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকার এখন ‘সিন্ডিকেট’ বা কারসাজির পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যার দিকেও নজর দিচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে পরিবহন ও অবকাঠামোর উচ্চ ব্যয়ও পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে।
সরকার টিসিবির কার্যক্রম আরও আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ও বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সুবিধার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, টিসিবির মাধ্যমে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হলেও দেশের সামগ্রিক বাজারে স্থায়ী স্বস্তি আনতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার, কম পরিবহন ব্যয় এবং দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এখনো যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। যেসব ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন, তাদেরও যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসে মূল্যস্ফীতির সূচকে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বাজারে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরেনি। মূল্যস্ফীতি কমার এই প্রবণতা ধরে রেখে পণ্যের সরবরাহ, পরিবহন, উৎপাদন খরচ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলেই কাগজের স্বস্তি বাস্তব বাজারে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au