সিডনির উত্তর-পশ্চিমে ১১ বছরের শিশুর মুখ ও ঘাড়ে গুলি, আটক ৩
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ১১ বছরের এক শিশুকে মুখ ও ঘাড়ে গুলি করার ঘটনায় ১৮ বছর বয়সী তিন যুবককে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে…
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ও প্রতিরক্ষা স্থাপনা থেকে নিরাপত্তা শঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল চীনা প্রতিষ্ঠান দাহুয়া টেকনোলজির (Dahua Technology) শত শত সিসিটিভি ক্যামেরা। এক বছর না পেরোতেই একই প্রতিষ্ঠানের তৈরি ক্যামেরা বৈদ্যুতিক গাড়িতে (ইভি) ব্যবহার হচ্ছে বলে এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (এবিসি) অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘ফোর কর্নার্স’ জানিয়েছে, চীনা ব্র্যান্ড লিপমোটরের (Leapmotor) গাড়িতে দাহুয়ার তৈরি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকারি ভবন ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় দাহুয়ার তৈরি শত শত ক্যামেরা পাওয়া যায়। নিরাপত্তা ও নজরদারির আশঙ্কায় সেগুলো সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
তবে পরে দেখা যায়, গাড়ি নির্মাণে যুক্ত হয়েছে দাহুয়া। অস্ট্রেলিয়ার বাজারে ২০২৪ সালে লিপমোটর বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে আসে। কম দামের পাশাপাশি গাড়ির প্রযুক্তিগত সুবিধাকেও এর অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
লিপমোটরের C10 মডেলের গাড়িতে ছয়টি ক্যামেরা রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে গাড়ির চারপাশ ও ভেতরের ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব। এর কয়েকটি ক্যামেরা দাহুয়ার তৈরি বলে জানিয়েছে ‘ফোর কর্নার্স’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ক্যামেরা থাকা গাড়ি অস্ট্রেলিয়ার কিছু প্রতিরক্ষা স্থাপনার আশপাশে চলাচল বা পার্ক করার ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো বাধার মুখে পড়ে না।

লিপমোটরের গাড়িগুলোতে, অন্যান্য অনেক বৈদ্যুতিক গাড়ির মতোই, চারপাশের সবকিছু ধারণ করার জন্য ক্যামেরা রয়েছে। (ফোর কর্নার্স)। ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা উপদেষ্টা অ্যালাস্টেয়ার ম্যাকগিবন বলেছেন, আধুনিক ইভিতে থাকা ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন এগুলোকে সম্ভাব্য নজরদারি যন্ত্রে পরিণত করতে পারে।
তাঁর মতে, কোনো সরকারি ভবনের কাছে কৌশলগতভাবে একটি ইভি রাখা হলে গাড়িটির ক্যামেরা দিয়ে কর্মীদের আসা-যাওয়ার তথ্য এবং কর্মঘণ্টার ধরন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
ম্যাকগিবন বলেন, কর্মীদের চলাচলের ধরন বদলে গেলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা সংকটের সময় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক সংযুক্ত গাড়ি একসঙ্গে ব্যবহৃত হলে ভিডিও ও ইলেকট্রনিক তথ্যের একটি বড় নেটওয়ার্ক তৈরি হতে পারে।
চীনা বৈদ্যুতিক গাড়িকে সম্ভাব্য রিয়েল-টাইম নজরদারি যন্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কায় কয়েকটি দেশে সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনায় এসব গাড়ির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে গত বছর চীনা তৈরি ইভি এবং চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা কিছু গাড়িকে নির্দিষ্ট সংবেদনশীল স্থাপনা ও প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। একটি ঘটনায় সামরিক কর্তৃপক্ষ গাড়িগুলোকে তিন কিলোমিটারের বেশি দূরে পার্ক করার নির্দেশ দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যালাস্টেয়ার ম্যাকগিবন বলেছেন, চীনা প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত গাড়ি সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত। (ফোর কর্নার্স: রন ফোলি)
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেছেন, দেশটিতে সংযুক্ত গাড়ির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে চীনা ইভির ওপর দেশটিতে কোনো blanket ban বা সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা বিভাগ সংযুক্ত গাড়ির ক্ষেত্রে কী ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে, তা প্রকাশ করেনি।
আগস্টে ‘ফোর কর্নার্স’ ক্যানবেরার এমন একটি পাবলিক কার পার্ক পরিদর্শন করে, যার একদিকে অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইও, প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং অস্ট্রেলিয়ান সিগন্যালস ডিরেক্টরেটের সদর দপ্তর।
সেখানে ২২টি বৈদ্যুতিক গাড়ির মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল চীনা ব্র্যান্ডের।
পরে ‘ফোর কর্নার্স’ একটি লিপমোটর গাড়ি নিয়ে ক্যানবেরার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখে। গাড়িটি রয়্যাল মিলিটারি কলেজ, ডানট্রুন, এএসআইওর সদর দপ্তরের পাশ দিয়ে এবং রাসেল ডিফেন্স প্রিসিঙ্কট এলাকায় চালানো হয়।
ম্যাকগিবন মনে করেন, চীনা প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত গাড়ির সামরিক ঘাঁটি, গোয়েন্দা স্থাপনা, সংবেদনশীল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এলাকায় চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত।
অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলের প্রতিরক্ষা বিষয়ক মুখপাত্র জেমস প্যাটারসন বলেন, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দাহুয়ার ক্যামেরা নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন ছিল যে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত নয়, এমন ক্যামেরাও প্রতিরক্ষা স্থাপনা থেকে সরানো হয়েছিল।
তাঁর প্রশ্ন, প্রতিরক্ষা ঘাঁটি থেকে দাহুয়ার ক্যামেরা সরিয়ে ফেলার পর একই প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি থাকা সংযুক্ত গাড়ি কীভাবে সেসব স্থাপনার আশপাশে চলাচল করতে পারে।
লিপমোটরের অস্ট্রেলিয়ায় তিনটি মডেল বিক্রি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ‘অটোমোটিভ বিশ্বের হুয়াওয়ে’ হওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিল।
হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, লিপমোটরের সঙ্গে দাহুয়ার একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের চলমান সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় ক্যামেরা, সেন্সর ও রাডার সরবরাহের কথা রয়েছে।
‘ফোর কর্নার্স’ লিপমোটরের একটি পেছনের ক্যামেরা কিনে পরীক্ষা করে। সেটির লেবেলে দাহুয়ার পরিচিতি ‘DH’ পাওয়া যায়।

লিপমোটর গাড়ির একটি ক্যামেরা। (ফোর কর্নার্স: নিক উইগিন্স)
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট-সংযুক্ত সব গাড়ির ক্ষেত্রেই তথ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে। তবে চীনা ইভির ক্ষেত্রে চীনের নজরদারি ও সাইবার কার্যক্রমের অতীত রেকর্ড এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা আইনের কারণে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীনের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় প্রয়োজন হলে দেশটির কোম্পানিগুলোকে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ম্যাকগিবনের মতে, আধুনিক ইভিগুলো মূলত সফটওয়্যারনির্ভর। এসব সফটওয়্যার দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ ও আপডেট করা যায়। ফলে গাড়ির ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন মালিকের অজান্তে সক্রিয় করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে নিরাপত্তা প্রশ্ন রয়েছে।
তবে এসব সম্ভাব্য ঝুঁকি বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট লিপমোটর গাড়িতে ঘটেছে, এমন প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
লিপমোটরের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠালেও প্রতিষ্ঠানটি ‘ফোর কর্নার্স’-এর প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
চীনও বিদেশি বৈদ্যুতিক গাড়িকে নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখিয়েছে। ২০২১ সালে চীনা কর্তৃপক্ষ সাংহাইয়ের কারখানায় তৈরি টেসলাসহ কিছু টেসলা গাড়িকে রাজনৈতিক ও সামরিক-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী দলের প্রতিরক্ষা মুখপাত্র জেমস প্যাটারসন বলেন, চীন যদি নিজেদের দেশে বিদেশি গাড়িকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে অস্ট্রেলিয়ায় চীনা নির্মাতাদের গাড়ি নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য, অস্ট্রেলিয়া সরকারের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
আধুনিক ইভিতে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, সেন্সর এবং ইন্টারনেট সংযোগ ক্রমেই সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে। ফলে গাড়ি শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের একটি সংযুক্ত ডিভাইসেও পরিণত হচ্ছে। ‘ফোর কর্নার্স’-এর অনুসন্ধানে মূলত এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকিই সামনে আনা হয়েছে।
সূত্র: এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au