জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউইয়র্কে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: এএফপি
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শুরু হয়েছে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। অধিবেশনের প্রথম দিন মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রায় ৩৭ মিনিটের ভাষণে ইরান যুদ্ধ, গাজা, জলবায়ু পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার, ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মার্কিন অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। তবে ভাষণের বেশ কয়েকটি দাবিকে পরে বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণে ভুল, বিভ্রান্তিকর বা অতিরঞ্জিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি
ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ক্ষমতা নেওয়ার পর তিনি আটটি যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। এটি তাঁর পুরোনো একটি দাবি।
তিনি যেসব সংঘাতের কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান এবং গাজা। এর সঙ্গে তিনি ইসরায়েল-ইরান এবং মিসর-ইথিওপিয়ার বিরোধকেও তালিকায় রেখেছেন।
তবে CNN-এর ফ্যাক্ট-চেক অনুযায়ী, আটটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি অতিরঞ্জিত। ট্রাম্পের তালিকায় থাকা মিসর-ইথিওপিয়ার বিষয়টি মূলত একটি বাঁধ নির্মাণ নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধ ছিল, যুদ্ধ নয়। একইভাবে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে কসোভো-সার্বিয়া পরিস্থিতিও যুদ্ধাবস্থা ছিল না।
রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি হলেও সংঘাত পুরোপুরি শেষ হয়েছে বলা যায় না। গাজার ক্ষেত্রেও যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা হলেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার তথ্য রয়েছে। ফলে ওই সংঘাতকে পুরোপুরি ‘শেষ’ করার দাবি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
‘গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে ১২ বছরে সবাই মারা যাবে’?
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, একসময় যাঁরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কথা বলতেন, তাঁরাই নাকি বলেছিলেন ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে। পরে পৃথিবী উষ্ণ না হয়ে ঠান্ডা হতে থাকায় ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নাম বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এই বক্তব্যের কয়েকটি অংশই তথ্যের সঙ্গে মেলে না।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত টানা ১১ বছর ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল ওই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছর। ফলে পৃথিবী ঠান্ডা হওয়ার দাবি বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ ছাড়া জলবায়ুবিজ্ঞানীরা ১২ বছরের মধ্যে পৃথিবীর সবাই মারা যাবে, এমন কোনো পূর্বাভাস দেননি। ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত জলবায়ু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে হলে পরবর্তী ১২ বছরে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। সেটিকে ‘১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে’ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ ও ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ও একই অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাকে বোঝাতে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ এবং এর বিস্তৃত পরিবেশগত প্রভাব বোঝাতে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দাবি
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেন, তাঁর প্রশাসন বিশ্বজুড়ে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে।
কিন্তু এই অঙ্কের পক্ষে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি। ট্রাম্পের ভাষণের সময় হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিনিয়োগের ঘোষণার পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার।
ফ্যাক্ট-চেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের তালিকায় থাকা কিছু অঙ্ক সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং মার্কিন কোম্পানির ঘোষণাকেও একই হিসাবের মধ্যে ধরা হয়েছে। ফলে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে কোনো ঘাটতি নেই?
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এমন খবর নাকচ করে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এত বেশি অস্ত্র রয়েছে যে সেগুলো কখনো ব্যবহার করার কথাও ভাবা যায় না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হারে অস্ত্র তৈরি হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে ঠিক কত অস্ত্র রয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। ফলে ট্রাম্পের সামগ্রিক দাবি পুরোপুরি যাচাই করা কঠিন।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক মার্কিন সরকারি প্রতিবেদনগুলোতে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেল এবং কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে।
ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বড় একটি দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, গত বছরের ২০ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় শহরটি অপরাধে জর্জরিত ছিল। এখন সেখানে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে এবং তা শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
তবে সামগ্রিক অপরাধের হিসাব এই দাবিকে সমর্থন করে না।
ফ্যাক্ট-চেক অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ কমেছে ঠিকই, কিন্তু সামগ্রিকভাবে ৮৭ শতাংশ নয়। চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শহরটিতে ১৫ হাজারের বেশি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ কম।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিউইয়র্কে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬।ছবি: এএফপি
হোয়াইট হাউস অতীতে অপরাধের নির্দিষ্ট কিছু ধরন, যেমন অগ্নিসংযোগ বা হত্যাকাণ্ডের হার কমার তথ্য সামনে এনে ট্রাম্পের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। কিন্তু এসব নির্দিষ্ট অপরাধের পরিসংখ্যানকে সামগ্রিক অপরাধ কমার হার হিসেবে দেখানো হলে তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
সব দাবি কি মিথ্যা?
ট্রাম্পের ভাষণের সব বক্তব্যকে একইভাবে ‘মিথ্যা’ বলা যায় না। কিছু বক্তব্য ছিল তথ্যগতভাবে ভুল, কিছু ছিল অতিরঞ্জিত, আবার কিছু দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে যুদ্ধ বন্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, অস্ত্রভান্ডার এবং ওয়াশিংটনের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির সঙ্গে প্রকাশিত তথ্য ও সরকারি পরিসংখ্যানের উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি রয়েছে।
ফলে জাতিসংঘে দেওয়া ট্রাম্পের ভাষণের একটি বড় অংশকে তথ্য-যাচাইয়ের আওতায় আনতে হয়েছে, বিশেষ করে তাঁর প্রশাসনের অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির প্রভাব নিয়ে করা দাবিগুলো।
সূত্র: সিএনএন