তীব্র ‘আর্থিক চাপে’ বড় ছাঁটাইয়ের পথে বিবিসি
তীব্র আর্থিক চাপ মোকাবিলায় ব্যয় কমানোর বড় পরিকল্পনা নিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। এর অংশ হিসেবে আগামী দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিভাগে সর্বোচ্চ ২ হাজার পদ…
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস চীন ও ভারত। শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য দীর্ঘদিন ধরে এই দুই দেশের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হলেও এখন দেশটি থেকে আমদানিও বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কি চীন ও ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস হয়ে উঠতে পারবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানিও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়ে ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে জ্বালানি, কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, সামরিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার বিষয়ে চুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা ও নীতি সমন্বয় উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক মনে করেন, বাংলাদেশের আমদানি ও ভোগের ধরন বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীন ও ভারতকে সামগ্রিকভাবে ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে চীন ও ভারতের সরবরাহব্যবস্থা গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ তুলা, সুতা, কাপড়, রং, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। এসব পণ্যের জন্য চীন ও ভারতের বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থা রয়েছে। এম এ রাজ্জাকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি এবং বর্তমানে চীন বিশ্বে সবচেয়ে কার্যকর সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম দেশ।
কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে তুলা, সয়াবিন, গম ও ভুট্টা আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্র বড় কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশ হলেও এসব পণ্যের সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান সরবরাহকারী নয়।
২০২৫-২৬ বিপণন বছরে সাত বছর পর বাংলাদেশ আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভুট্টা আমদানি শুরু করে। তবে ওই সময়ে বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানির মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ব্রাজিল থেকে এসেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ এবং ভারত থেকে ২৪ শতাংশ।
গমের ক্ষেত্রেও রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশ প্রায় ৬৬ লাখ টন গম আমদানি করেছে। এর বড় অংশ এসেছে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে।
তবে জ্বালানি ও উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ১৫ বছরে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কেনা কিংবা কেনার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের গম, সয়াবিন ও তুলা কেনার বিষয়েও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
গমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন পর্যন্ত মার্কিন গম কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার টন গম কিনেছে। চলতি বিপণন বছরের জন্য এরই মধ্যে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম কেনার চুক্তিও হয়েছে।
উড়োজাহাজ ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে, যার আনুমানিক মূল্য ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে এপ্রিল মাসে আরও ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছিল বিমান, যার মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও জুলাই মাসে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়।
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, দুগ্ধজাত পণ্য, মাংস, পোলট্রি ও জৈবপ্রযুক্তি পণ্যের বাংলাদেশি বাজারে প্রবেশও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনকে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে নিজস্ব পরীক্ষার পরিবর্তে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করবে। পাশাপাশি মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আগাম পরীক্ষার বাধ্যবাধকতাও কমানোর বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক, যিনি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, বলেন বাংলাদেশের বাজার ও অর্থনৈতিক কাঠামো বিবেচনায় নিতে হবে। সাধারণ পণ্যের আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীন ও ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দূরত্বও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। চীন ও ভারত থেকে বাংলাদেশ তুলনামূলক দ্রুত পণ্য হাতে পায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ সমুদ্রপথে পণ্য আনতে বেশি সময় লাগে। এতে পরিবহন ব্যয়, মজুত খরচ ও অর্থায়নের ব্যয় বাড়ে, যা দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহনির্ভর শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে উচ্চমূল্যের ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য, এলএনজি, সেমিকন্ডাক্টর ও উড়োজাহাজের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র চীন ও ভারতের তুলনায় বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে। তবে তুলা, সয়াবিন ও গমের মতো পণ্যে চীন ও ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তবসম্মত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি বাজারে চীন ও ভারতের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে জ্বালানি, উড়োজাহাজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য ও কিছু কৃষিপণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ চুক্তির কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশের আমদানি উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব বাড়লেও চীন ও ভারতকে সামগ্রিকভাবে ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চাহিদা, পণ্যের দাম, সরবরাহব্যবস্থা ও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর।
সুত্রঃ The Daily Star
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au