বাংলাদেশ

মতামত: ড. মঞ্জুরে খোদা

পতিত কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসকরা কি ক্ষমতায় ফিরতে পারে?

গবেষণা বলছে, ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তিই নয়, দল, উত্তরাধিকার-অনুসারীরাও ক্ষমতায় ফেরে

  • 12:19 pm - September 26, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৫ বার
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচিত কর্তৃত্ববাদী-স্বৈরশাসক, তাদের দল ও উত্তরসূরির ক্ষমতায় ফেরার ঐতিহাসিক ঘটনা। মতামত ড. মঞ্জুরে খোদা

বাংলাদেশে একটি আলোচনা প্রবল আছে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সকল কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসক ও দলের পতন হয়েছে তারা আর কখনো ক্ষমতায় ফিরে আসেনি। শেখ হাসিনার পতনের পর অনেকে বলছেন, কর্তৃত্ববাদী হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ আর কখনো ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলী রীয়াজও তাঁর এক লেখায় এমন মত প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির তুলনামুলক ইতিহাস গবেষণায় এই বক্তব্য কতটা অসাড় ও অগ্রহণযোগ্য তা কেস স্টাডির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো।

জেমস লক্সটনের গবেষণা:
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস লক্সটনের “স্বৈরশাসনের অবসানের পর: বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্তরসূরি রাজনৈতিক দল (Life After Dictatorship: Authoritarian Successor Parties Worldwide)” নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, তৃতীয় গণতান্ত্রিক তরঙ্গের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশে পুরোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল টিকে ছিল; এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি দেশে ভোটাররা পরবর্তীতে সেই দলগুলোকে আবার সরকারে ফিরিয়েছেন।
জেমস লক্সটনের গবেষণা অনুযায়ি এ যাবৎকাল যে সকল কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে তাদের মধ্যে চার ভাগের তিনভাগই কোন না কোন ভাবে ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। এই পরিসংখ্যান স্বৈরশাসকদের ক্ষমতায় না ফেরার ধারণাকে নাকচ করে। তাহলে যারা বলছেন, কর্তৃত্বপরায়ন শাসকের পতন হলে আর কখনো ক্ষমতায় ফিরতে পারে না কিসের ভিত্তিতে বলছেন? তারা কি এই চার ভাগের এক ভাগকেই তাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করছেন? ইতিহাসের এই খন্ডিত চিত্রকেই চুড়ান্ত ভেবে আওয়ামী লীগকে রাজনীতির বাইরে রেখে ক্ষমতায় থাকতে চান? গবেষণায় প্রমাণিত কর্তৃত্ববাদী শাসকদের তিন-চতুর্থাংশের নানাভাবে ক্ষমতায় ফেরার সত্য সে কথা বলে না।
জাপানের চার অধ্যাপকের গবেষণা:
জাপানের ৪টি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় টোকিও, ওসাকা, সুকবো ও কুয়ানসেইয়ের চার জন খ্যাতিমান অধ্যাপক ও গবেষক, তাকু ইউকাওয়া, কাওরু হিদাকা, মাসানোরি কুবোতা, কাওরি কুশিমা, ১৯৭০–২০২০ সময়কালে নির্বাসনে যাওয়া ১০১ জন ক্ষমতাচ্যুত নেতার তথ্য নিয়ে পরিমাণগত বিশ্লেষণ এবং কয়েকটি কেস স্টাডি করেছেন। তাঁদের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, নির্বাসনকে সবসময় রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ২০২৫ সালের একই গবেষকদল একটি ‘ধারাবাহিক তথ্যভিত্তিক’ গবেষণাতেও দেখান যে, নির্বাসিত নেতাদের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসেন (Returning home to politics: The political determinants of ousted leaders’ trajectories after exile), আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুনরায় ক্ষমতায়ও আসে।
২০২৬ সালের গবেষণার বিশেষত্ব হলো তারা শুধু “নির্বাসনের পর কে ক্ষমতায় ফিরলেন?” প্রশ্নটি করেননি; বরং প্রথম ধাপ হিসেবে দেখেছেন “কে দেশে ফিরতে পারলেন?” সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত নেতারা পরবর্তীতে দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সম্ভাবনাময়। বিপরীতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের দেশে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ একজন নেতা কীভাবে ক্ষমতা হারিয়েছেন, সেটি নির্বাসনের পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ’নির্বাসনে যাওয়া মানেই ফিরে এসে ক্ষমতা দখল’ এমন নয়। বরং নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার সম্ভাবনা এবং প্রত্যাবর্তনের পর রাজনৈতিক পুনঃসম্পৃক্ততার একটি কাঠামো তৈরি করে। পরবর্তীতে দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে অনেকে আবার ক্ষমতায়ও ফিরে আসেন। নির্বাসন, কারাবাস, মৃত্যুদণ্ডকে রাজনৈতিক শাস্তি হিসেবে দেখা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা প্রচলিত ধারণাকে তাই পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচিত কর্তৃত্ববাদী-স্বৈরশাসক, তাদের দল ও উত্তরসূরির ক্ষমতায় ফেরার ঐতিহাসিক ঘটনা।
১। ফিলিপাইনে মার্কোস পরিবারের প্রত্যাবর্তন:
ফের্দিনান্দ মার্কোস ১৯৮৬ সালে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নির্বাসনে যান। কিন্তু পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন থেমে থাকেনি। মার্কোস পরিবার ১৯৯১ সালে দেশে ফিরে বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠন করে। অবশেষে ৩৬ বছর পর ২০২২ সালে তাঁর ছেলে ফের্দিনান্দ “বংবং” মার্কোস জুনিয়র প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বংবং ৩ কোটি ১০ লাখ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, সেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি পান ১ কোটি ৪৬ লাখ ভোট। এটি পুরোনো কর্তৃত্ববাদী পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ব্যাপক দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কুখ্যাতি অর্জন করা মার্কোস পরিবার আবারও শাসন ক্ষমতায় ফিরবে, এটা এক সময় ছিল অকল্পনীয়।
২। দক্ষিণ কোরিয়ায় পার্ক চুং-হির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার:
সামরিক শাসক পার্ক চুং-হি ১৯৬১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করেন এবং ১৯৭৯ সালে নিহত হন। প্রায় ৩৩ বছর পর তাঁর মেয়ে পার্ক গিউন-হে ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এটি অবশ্য বাবার নিজের প্রত্যাবর্তন নয়; বরং এক পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসক পরিবারের রাজনীতিতে ফিরে আসার উদাহরণ।
৩। ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ কন্যা মেঘবতির ক্ষমতায় ফেরা:
ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার স্থপতি ও প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ ১৯৬৫ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর ক্রমশ রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। জেনারেল সুহার্তো ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করে ১৯৬৭ সালে সুকর্ণকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সুহার্ত প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৭০ সালে সুকর্ণ মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিলীন হয়নি। তাঁর কন্যা মেঘবতি সুকর্ণপুত্রী ৯০-এর দশকে ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৯৯ সালে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ২০০১ সালে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। সুকর্ণের পতনের প্রায় ৩৪ বছর পর তাঁর কন্যা রাষ্ট্রপতি হন।
৪। নাইজেরিয়ায় মুহাম্মাদু বুহারি:
নাইজেরিয়ার মুহাম্মাদু বুহারি ১৯৮৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি আরেক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর প্রায় তিন দশক তিনি নির্বাচনে পরাজিত হতে হতে ২০১৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় ৩০ বছর পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে ফেরেন।
৫। আর্জেন্টিনায় হুয়ান পেরন:
আর্জেন্টিনায় হুয়ান দোমিঙ্গো পেরনের প্রত্যাবর্তন আরও নাটকীয়। ১৯৫৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পেরন প্রায় ১৮ বছর নির্বাসনে ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তাঁর দল আবার আন্দোলন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসে। প্রথমে তাঁর মনোনীত প্রার্থী হেক্টর কাম্পোরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন; এরপর পেরন দেশে ফিরলে একই বছর নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নিজেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দীর্ঘ নির্বাসন ও ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি আবারো রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসেন।
৬। আলবেনিয়ায় সালিই বেরিশা:
ইউরোপের আলবেনিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন পতনের পর সালিই বেরিশা দেশটির প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯৭ সালে ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে তাঁর প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হয় এবং তিনি ক্ষমতা ছাড়েন। কিন্তু রাজনীতিতে সক্রীয় থাকেন। প্রায় আট বছর পর, ২০০৫ সালের নির্বাচনে তাঁর ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।
৭. মেক্সিকোতে পিআরআই-এর প্রত্যাবর্তন:
মেক্সিকোর ইনস্টিটিউসনাল রিভ্যুলশনারি পার্টি (PRI) ১৯২৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭১ বছর ধারাবাহিকভাবে দেশ শাসন করেছিল। ২০০০ সালে ভিসেন্তে ফক্সের নেতৃত্বে বিএএন ক্ষমতায় এসে পিআরআইকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু পিআরআই ভেঙে পড়েনি; ১২ বছর বিরোধী দলে থাকার পর ২০১২ সালে এনরিকে পেনিয়া নিয়েতোকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে পিআরআই আবার জাতীয় ক্ষমতায় ফিরে আসে। রাজনৈতিক গবেষণায় পিআরআইকে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসক দল হিসেবে ক্ষমতায় ফিরে আসার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
৮. পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট উত্তরসূরির প্রত্যাবর্তন:
১৯৮৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের পর পোল্যান্ডে সাবেক কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা নতুন নামে ডেমোক্রেটিক লেফ্টে এ্যালায়েন্সের (SLD) অধীনে সংগঠিত হয়। অনেকে ধারণা করেছিলেন, কমিউনিস্ট শাসনের পতনের পর তাদের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ। কিন্তু মাত্র চার বছর পর, ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে এসএলডি ও তার মিত্র পলিশ পেসেন্ট পার্টি ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৫ সালে এসএলডি নেতা আলেকসান্দের কোয়াশনিয়েভস্কি প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হন। অর্থাৎ কমিউনিস্ট শাসনের পতনের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি শক্তি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
৯. পানামায় নোরিয়েগা অনুসারিদের প্রত্যাবর্তন:
জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগা ’৮০-এর দশকে পানামার শাসক ছিলেন এবং তাঁর শাসনের সঙ্গে ডেমোক্রেটিক রেভ্যুলসনারি পার্টি (PRD) ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ১৯৮৯ সালে নরিয়েগা শাসনের পতনের পর পিআরডি বিরোধী অবস্থানে চলে যায়। কিন্তু দলটি বিলুপ্ত হয়নি। ২০০৪ সালের নির্বাচনে পিআরডি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। মার্টিন টরিজস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১০. স্পেনে ফ্রাঙ্কো-যুগের উত্তরাধিকারের ক্ষমতা গ্রহণ:
স্পেনে ফ্রানসিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসন ১৯৭৫ সালে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়। তাঁর আমলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একটি অংশ পরবর্তী গণতান্ত্রিক রূপান্তরে আলিয়াঞ্জা পপুলার (AP) গঠন করে। এপি’র প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ফ্রাঙ্কো’র গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ছিলেন। ১৯৮৯ সালে এপি পুনর্গঠিত হয়ে পিপলস পার্টি (PP) হয় এবং জোসে মারিয়া আনজারের নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে। এটি ফ্রাঙ্কোর নিজের বা তাঁর পরিবারের প্রত্যাবর্তন না হলেও তাঁর অনুসারীদের ক্ষমতায় ফেরার উদাহরণ।
১১. তিউনিসিয়ায় বেন আলীর অনুসারীদের প্রত্যাবর্তন:
২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট বেন আলী ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন এবং তাঁর কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রটিক র্যালি (RCD) বিলুপ্ত হয়। কিন্তু তাঁর শাসনের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক এলিটরা রাজনীতিতে থেকে যান। ২০১২ সালে বেন আলীর সাবেক আরসিডি’র নেতারা নিদা তুনেস নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নিদা তুনেস ২১৭ আসনের মধ্যে ৮৬টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হয় এবং পরে এর নেতা বেজি কায়েদ এসেবসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিউনিসিয়ায় বেন আলী নিজে সরাসরি ক্ষমতায় না বসলেও তাঁর অনুসারীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসার উদাহরণ সৃষ্টি করেন।
১২। লিবিয়ায় গাদ্দাফি অনুসারীরা সক্রীয়:
লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত ও নির্মমভাবে নিহত মোয়ায়েম গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি। তাঁর পিতার আদর্শে পিএফএলএল (Popular Front for the Liberation of Libya – PFLL) রাজনৈতিক দলকে সংগঠিত করেন। ২০২১ সালে লিবিয়ার নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাকে অযোগ্য করায় তিনি নির্বাচন করতে পারেননি। তবে লিবিয়ায় সেই নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়নি এবং আজো কোন নির্বাচন হয়নি। সেখানে গাদ্দাফির মতাদর্শে বিশ্বাসী একাধিক রাজনৈতিক দল সক্রীয় আছে, তাদের একটি লিবিয়ান পপুলার ন্যাশনাল মুভমেন্ট।
ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তিই নয়, দল, উত্তরাধিকার-অনুসারীরাও ক্ষমতায় ফেরে:
ইতিহাসের শিক্ষা হলো কোনো স্বৈরশাসক বা কর্তৃত্ববাদী দলের পতন মানেই তার রাজনৈতিক মৃত্যু বা স্থায়ীভাবে দাফন হয়ে যাওয়া নয়। কখনো ব্যক্তি ফিরে আসেন, কখনো তাঁর সন্তান বা পরিবার ফিরে আসে, কখনো পুরোনো দল নতুন নাম ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে ফিরে আসে। তবে প্রত্যেকটি দেশের প্রত্যাবর্তনের কারণ এক নয়, জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক সংগঠন, পারিবারিক উত্তরাধিকার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিরোধীদের ব্যর্থতা, নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান এবং অতীতের স্মৃতি, সবকিছুর ভূমিকা থাকতে পারে। গবেষণা দেখিয়েছে যে নির্বাসনে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরবর্তীতে নিজ দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে আবার ক্ষমতাতেও ফিরেছেন।

সে কারণে, “গণঅভ্যুত্থানে পতন হলে কোনো স্বৈরশাসক বা তার রাজনৈতিক শক্তি আর কখনো ফিরে আসতে পারে না” এমন বক্তব্য ইতিহাসের কোনো সাধারণ নিয়ম নয়। বরং ইতিহাস প্রমাণিত সত্য হচ্ছে, রাজনৈতিক শক্তির পতন ও রাজনৈতিক বিলুপ্তি এক বিষয় নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতা আলাদা।

————————————————————-

ড. মঞ্জুরে খোদা, লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

————————————————————-

তথ্যসূত্রঃ

১। Returning home to politics: The political determinants of ousted leaders’ trajectories after exile, Taku Yukawa, Kaoru Hidaka, Masanori Kubota & Kaori Kushima, International Political Science Review, April 26, 2026 (Online),

2. Mainwaring, Scott, and James Loxton, eds. Life After Dictatorship: Authoritarian Successor Parties Worldwide. Cambridge University Press, 2018.

৩। পলাতক স্বৈরশাসকদের পরিণতি কী হয়, আলী রীয়াজ, প্রথম আলো, ৪ আগস্ট ২০২৬

৪। আওয়ামী লীগ কি মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করবে? ড. মঞ্জরে খোদা, মুক্তমনা, ২০২৫

এই শাখার আরও খবর

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালুর দাবি শেখ হাসিনার

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন এক রেকর্ড করা বক্তব্যে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হয়রানি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং সংখ্যালঘু, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে…

নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের উদ্দেশে রেকর্ডেড বক্তব্য শেখ হাসিনার, সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ

OTN Bangla Desk: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কভার করতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত সাংবাদিকদের উদ্দেশে একটি রেকর্ডেড রাজনৈতিক…

হিমালয়ের পানিনির্ভরতার অর্থমূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান

হিমালয়ের পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অর্থনীতির নির্ভরতার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করেছে ভারত। এবার একইভাবে বাংলাদেশেরও হিমালয়ভিত্তিক পানিনির্ভরতার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে…

শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির বিরোধ: সমঝোতা চায় ওয়াশিংটন

OTN Bangla Desk: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার সমাধানে দুই দেশ আলোচনা করে একটি সমঝোতায়…

অস্ট্রেলিয়ায় কৃষিশ্রমিক ভিসা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার—যা জানা জরুরি

OTN Bangla Desk: অস্ট্রেলিয়ার কৃষিখাতে আসন্ন ফসল তোলার মৌসুমে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় কিছু জরুরি ওয়ার্কিং হলিডে মেকার ভিসার (WHM) আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নেওয়া…

কুষ্টিয়ার মহাশ্মশানে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক, চিতা-সমাধিতে জুতা পায়ে ছবি

কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে একদল যুবকের গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে শ্মশানের চিতা ও মৃত ব্যক্তির সমাধির ওপর জুতা…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au