বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন এক রেকর্ড করা বক্তব্যে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হয়রানি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং সংখ্যালঘু, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালু করা, আটক দলীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মুক্তি এবং তার ভাষায় ‘সাজানো মামলা’ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কাভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের উদ্দেশে এই রেকর্ড করা বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। বক্তব্যে কোনো প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল না। ভারতের ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে টানাপোড়েনের মধ্যেই তার নতুন এই বক্তব্য প্রকাশ্যে এলো।
বক্তব্যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, দেশের মানুষ নানা ধরনের দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে এবং নারী ও শিশুরাও এর বাইরে নেই। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুনে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২২ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের জুনে তা কমে ৩ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, এসব কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, এর সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবন ও পরিবারের সংকট জড়িয়ে আছে। কর্মহীন শ্রমিক, বীজ ও সার কিনতে সমস্যায় পড়া কৃষক, সন্তানদের খাবারের চাহিদা পূরণ নিয়ে চিন্তিত মা এবং শিক্ষাজীবন শেষ করেও কর্মসংস্থানের সুযোগ না পাওয়া তরুণদের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
নিজের ওপর একাধিকবার হামলার চেষ্টার কথাও বক্তব্যে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তিনি দাবি করেন, তাকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে এবং প্রতিবারই তিনি বেঁচে গেছেন। এবারও তিনি বেঁচে আছেন বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড চালুর দাবি
বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালুর দাবি জানান। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বন্ধ করে দিলেই সেই দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় না।
দেশের বড় একটি রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা পুরো বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া আটক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মুক্তি, তার ভাষায় ‘সাজানো মামলা’ প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধের দাবি জানান শেখ হাসিনা।
বক্তব্যে তিনি বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সংখ্যালঘু ও সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগও তোলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন
শেখ হাসিনার নতুন বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন তার ভারতে অবস্থান নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। বাংলাদেশ তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়েও ঢাকা আপত্তি জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফেরানোর বিষয়টিকেও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগে আগস্টে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালভাবে বক্তব্য দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ওই বক্তব্যের পরও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ও টানাপোড়েন নতুন করে সামনে আসে। এর আগে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন গণমাধ্যমকে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার বা প্রকাশ না করার আহ্বান জানিয়েছিল এবং এ বিষয়ে আইনি ও বিচারিক বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ করেছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্তের আহ্বান
নতুন বক্তব্যে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে নেওয়া বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নজরদারির আহ্বান জানান। তার দাবি, বিচার যদি শুধু একটি পক্ষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেটিকে ন্যায়বিচার বলা যায় না।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশেও বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের কষ্ট ও দুর্ভোগ তিনি ভুলে যাননি এবং তাদের আশা তার শক্তি।
শেখ হাসিনার এই নতুন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন মামলা ও আটকাদেশ এবং তার ভারতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়গুলো আবারও আলোচনায় এসেছে।
সুত্রঃ দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস