ছায়া নারী বিষয়ক মন্ত্রী মেলিসা ম্যাকইনটশ। ছবি: অ্যালেক্স এলিংহাউসেন
প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে জাতীয় পর্যায়ের জরুরি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। প্রস্তুতি, তথ্য বিশ্লেষণ ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
তবে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৫২ নারী নিহত হওয়ার পরও পারিবারিক ও গার্হস্থ্য সহিংসতা মোকাবিলায় একই ধরনের জাতীয় জরুরি ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির বিরোধী লিবারেল পার্টির ফ্রন্টবেঞ্চার ও ছায়া নারী বিষয়ক মন্ত্রী মেলিসা ম্যাকইনটশ।
তিনি বলেন, জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতির মহড়া চালিয়ে ব্যবস্থা নেয়। একই প্রযুক্তি ও পদ্ধতি নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় কেন ব্যবহার করা হবে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ম্যাকইনটশ গার্হস্থ্য ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা মোকাবিলায় একটি ‘ওয়ার রুম’ বা ‘সিচুয়েশন রুম’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চল এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো, ব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং সহিংসতার প্রবণতা বিশ্লেষণ করাও এর কাজ হবে।
ম্যাকইনটশ বলেন, যদি নারীর প্রতি সহিংসতাকে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সেটিকে সেভাবেই মোকাবিলা করা উচিত।

নিকিতা আজ্জোপার্দিকে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর মেলবোর্নের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাউথ মোরাংয়ে নিজ বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ছবি: সংগৃহীত
বোনকে হারিয়ে প্রতিরোধের দাবি
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মেলবোর্নের ৩৫ বছর বয়সী নিকিতা আজ্জোপার্দির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও। ২০২৪ সালে নিজ বাড়িতে তার সঙ্গী ৩৪ বছর বয়সী জোয়েল মিকালেফ তাকে লোহার ফায়ার স্টোকার দিয়ে একাধিকবার আঘাত করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দুই দিন পর পরিবারের একটি অনুষ্ঠানে নিকিতা উপস্থিত না হওয়ায় তাকে খুঁজতে গিয়ে গুরুতর মাথা ও মুখের আঘাতসহ মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
নিকিতার ভাই শন আজ্জোপার্দির দাবি, তার বোনের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব ছিল। তার ভাষ্য, নিরাপদভাবে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা থাকলে হয়তো তার বোন সাহায্য চাইতে পারতেন।
তিনি বলেন, অনেক নারীই সঙ্গীর ভয়ে থাকেন। তাই তাদের জন্য একটি কার্যকর সহায়তা নেটওয়ার্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়ায় নিহত নারী ও শিশুদের মানচিত্র।
সূত্র: অস্ট্রেলিয়ান ফেমিসাইড ওয়াচ
চলতি বছর ৫২ নারী ও ২০ শিশু নিহত
অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে ৪৩৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৩৩টি ছিল গার্হস্থ্য ও পারিবারিক সহিংসতাসংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে এ ধরনের সহিংসতার সম্পর্ক ছিল।
অস্ট্রেলিয়ান ফেমিসাইড ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৫২ নারী ও ২০ শিশু নিহত হয়েছে।
এর মধ্যে নিউ সাউথ ওয়েলসে গত সপ্তাহান্তে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে পৃথক তিনটি ঘটনায় তিন নারী নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বন্ডি বিচের ৯০ বছর বয়সী ভ্যালেনটিনা স্পিভাক, মোল রিভারের ৭০ বছর বয়সী এক নারী এবং ওয়াগা ওয়াগার ২৩ বছর বয়সী এক নারী। তিনটি ঘটনাই গার্হস্থ্য সহিংসতাসংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

ক্যাটি গ্যালাঘার অ্যাপটিকে অস্ট্রেলীয়দের জন্য সুবিধাজনক ও নিরাপদ একটি বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। ছবি: অ্যালেক্স এলিংহাউসেন
সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন
নারী বিষয়ক মন্ত্রী ক্যাটি গ্যালাঘার নিহত নারীদের পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং এ বিষয়ে দায়িত্বও নিতে হবে। তবে এ সমস্যার কোনো সহজ সমাধান নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত আগস্টে একাধিক আলোচিত যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য ও অঞ্চলগুলোর নেতারা বৈঠক করেন। সেখানে যৌন ও গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়ে সহায়তা চাইতে আসা নারীদের ঝুঁকির লক্ষণগুলো শনাক্ত করে প্রতিটি এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি নতুন জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন কাঠামো তৈরির বিষয়ে একমত হন তারা।
এ ছাড়া গার্হস্থ্য, পারিবারিক ও যৌন সহিংসতা মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের সেবার মান, ধারাবাহিকতা ও সহজলভ্যতার জন্য জাতীয় মানদণ্ড তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে অগ্রগতি জানাবে রাজ্য ও অঞ্চলগুলো।
তবে মেলিসা ম্যাকইনটশ মনে করেন, বিদ্যমান উদ্যোগের পাশাপাশি আরও দ্রুত ও জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে অস্ট্রেলিয়া দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। করোনা মহামারির সময়ও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল। একই ধরনের গতি ও জরুরি মনোভাব নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় কেন দেখা যাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শন আজ্জোপার্দিও সরকারের আরও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কারও পরিবারের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে হয়তো আরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
সূত্র: নাইন.কম.এইউ