টানা তিন শিরোপার পর কোচিং ছাড়ার ভাবনা ফাগানের। ছবিঃ সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল লিগ (এএফএল) ক্লাব ব্রিসবেন লায়ন্সকে টানা তৃতীয়বার প্রিমিয়ারশিপ জেতানোর পর ২০২৭ সালে কোচ হিসেবে থাকবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন ক্রিস ফাগান। দলের শীর্ষে থাকা অবস্থায় বিদায় নেওয়াকেই নিজের জন্য ‘স্বপ্নের সমাপ্তি’ হিসেবে দেখছেন ৬৫ বছর বয়সী এই কোচ।
শনিবার ব্রিসবেন লায়ন্সকে তৃতীয় টানা প্রিমিয়ারশিপ জেতান ফাগান। ম্যাচের চতুর্থ কোয়ার্টারের শেষ দিকে ১৭ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে তার দল ফ্রিম্যান্টলকে হারায়। এই জয়ের মধ্য দিয়ে লায়ন্সকে টানা তিনটি শিরোপা জেতানো কোচ হিসেবে কিংবদন্তি কোচ লেই ম্যাথিউজের পাশে জায়গা করে নেন ফাগান।
কোচ হিসেবে এক দশক পূর্ণ করা ফাগান এখন ১১তম মৌসুমে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত নন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, শিরোপা জয়ের পর এমন কথা বলা অদ্ভুত শোনাতে পারে, কিন্তু ব্যর্থ হওয়া পর্যন্ত কোচের দায়িত্ব আঁকড়ে থাকতে চান না তিনি।
ফাগান বলেন, ‘আমরা মাত্রই প্রিমিয়ারশিপ জিতেছি, এরপর আমি এমন কথা বলছি শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু আমি এমন একজন হতে চাই না, যে দল ব্যর্থ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমার ভেতরের একটা অংশ সত্যিই চায় দল যখন শীর্ষে, তখনই আমি সরে দাঁড়াই। সত্যি বলতে, অনেক দিক থেকেই এটাই শেষ করার স্বপ্নের মতো উপায়।’
কোচিং পেশার বাস্তবতা তুলে ধরে ফাগান বলেন, অধিকাংশ কোচের বিদায় শেষ পর্যন্ত সুখকর হয় না। সাধারণত কোনো এক পর্যায়ে কোচকে বরখাস্ত করা হয়।
‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশির ভাগ কোচের ক্ষেত্রে শেষটা প্রায়ই ট্র্যাজেডির মতো হয়, সাধারণত কোচকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়,’ বলেন তিনি।
২০২৭ সালেও দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক ও শারীরিক শক্তি তার রয়েছে কি না, সেটিও এখন বিবেচনা করছেন ফাগান। তার মতে, এএফএল কোচের দায়িত্বের সঙ্গে যে নিরন্তর চাপ ও দায়িত্ব জড়িয়ে থাকে, তা দীর্ঘদিন বহন করা সহজ নয়।
ফাগান বলেন, ‘এএফএল কোচ হিসেবে যে নিরন্তর দায়িত্ব ও চাপ থাকে, সেটি সামলানোর জন্য আমার এখনও প্রয়োজনীয় শক্তি আছে কি না, সেটা আমাকে ঠিক করতে হবে।’
‘আপনি নিজে এই কাজ না করা পর্যন্ত আমি কী বলছি, তা পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না। কিন্তু এই কাজ আপনার পুরো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। আমি জানি না, আমি এটা আর চালিয়ে যেতে চাই কি না।’
তবে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি খুব বেশি সময় নেবেন না বলেও জানিয়েছেন ফাগান। আপাতত তৃতীয় প্রিমিয়ারশিপের আনন্দ উদযাপন করতে চান তিনি।
কোচিং ছেড়ে দিলে কী করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে হেসে ফাগান বলেন, ‘অবসর নেব। আমার বয়স ৬৫।’
তবে পুরোপুরি ফুটবল থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই তার। কোচিং ছেড়ে দিলে ফুটবলের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকতে চান বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে সিনিয়র কোচের মতো তীব্র চাপ ও দায়িত্বের পর্যায়ে নয়।
ফাগান বলেন, ‘আমি যদি কোচিং চালিয়ে না যাই, তাহলে ফুটবলের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকতে চাই। তবে সিনিয়র কোচের জন্য যে মাত্রার তীব্রতা প্রয়োজন, সেই পর্যায়ে নয়। কারণ এটা আসলে একটা জীবনধারা।’
তিনি বলেন, ‘এটা কখনোই আপনাকে একা থাকতে দেয় না। বছরের ৩৬৫ দিন, সপ্তাহের সাত দিনই এটি আপনার মাথার মধ্যে থাকে।’
দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময় চিন্তা করতে হয় বলেও জানান তিনি। কোন খেলোয়াড়কে দলে নেওয়া হবে, পরের ম্যাচ কীভাবে খেলা হবে, অনুশীলনের ধরন কেমন হবে কিংবা দলের কৌশলে কী পরিবর্তন আনা যায়, এসব বিষয় সব সময়ই কোচের চিন্তার মধ্যে থাকে।
ফাগান বলেন, ‘আপনি সব সময় ক্লাব নিয়ে ভাবছেন, পরের ম্যাচ কী হতে পারে, কীভাবে নতুন খেলোয়াড় দলে আনা যায়, অনুশীলন কেমন হবে, কিংবা আমরা কীভাবে খেলার কৌশল পরিবর্তন করতে পারি। এসব বিষয় আমি ভালোবাসি। কিন্তু আপনি এটা চিরকাল করতে পারবেন না। তাই এখন দেখি কী হয়।’
তৃতীয়বারের মতো ব্রিসবেনকে শিরোপা এনে দেওয়ার পর ফাগানের প্রধান অনুভূতি ছিল গর্ব। তবে এই সাফল্যের কৃতিত্ব এককভাবে নিজের ওপর নিতে চাননি তিনি।
ফাগান ক্লাবের ফুটবল বিভাগে ড্যানি ড্যালির নেতৃত্ব, সহকারী কোচ এবং ‘প্রতিরোধী মানসিকতার’ খেলোয়াড়দের প্রশংসা করেন। তার মতে, পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে।
নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি দলের অন্য সবার মতোই নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। খেলোয়াড়দের অবদানও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচের শেষ চার মিনিটের প্রত্যাবর্তনকে নিজের দেখা সবচেয়ে অসাধারণ চার মিনিটের একটি বলেও উল্লেখ করেন ফাগান। তবে ফ্রিম্যান্টলের অধিনায়ক অ্যালেক্স পিয়ার্স তৃতীয় কোয়ার্টারে চোট পাওয়ার ঘটনাটিও ম্যাচের ফলাফলে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
ফাগান বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি মনে করি আপনারাও সবাই একমত হবেন, আজকের ম্যাচটি ফ্রিম্যান্টলেরই জেতা উচিত ছিল।’
তার মতে, ম্যাচের দীর্ঘ সময়জুড়ে ফ্রিম্যান্টলই ভালো খেলেছে। তাই প্রতিপক্ষের জন্য তার কিছুটা খারাপও লাগছে।
‘তারা দীর্ঘ সময় আমাদের চেয়ে ভালো ছিল। তাদের জন্য আমার একটু খারাপ লাগছে। তারা আজ অসাধারণ খেলেছে। তারাই জয় পাওয়ার যোগ্য ছিল,’ বলেন ফাগান।
তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পাওয়া সুযোগ কাজে লাগানোর কৃতিত্বও দলের প্রাপ্য বলে মনে করেন তিনি।
ফাগান বলেন, ‘আমরা ভাগ্যবান ছিলাম। আগের দুটি ম্যাচে আমি মনে করি না আমরা এমনটা ছিলাম। কিন্তু আজ আমরা কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছি এবং সেটাকে কাজে লাগানোর মতো ভালোও খেলেছি।’
টানা তিনটি প্রিমিয়ারশিপ জয়ের পর এখন ফাগানের সামনে মূল প্রশ্ন, ব্রিসবেন লায়ন্সের সঙ্গে নতুন করে আরেকটি মৌসুম শুরু করবেন, নাকি দলের সর্বোচ্চ সাফল্যের মুহূর্তেই কোচের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। সিদ্ধান্তটি তিনি শিগগিরই নেবেন বলে জানিয়েছেন।