বাংলাদেশ

রামু হামলার ১৪ বছর, বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের

  • 1:31 pm - September 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫৭ বার
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে সংঘটিত ওই হামলায় রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও ৩০টি বসতঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে ভয়াবহ হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময়েও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। তারা দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, ওই রাতে রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০টি বসতঘরে হামলা চালানো হয়। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকাতেও বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনা ঘটে।

তৎকালীন সময়ে উত্তম বড়ুয়া নামে এক বৌদ্ধ যুবকের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ সহিংসতার সূত্রপাত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অভিযোগের পর রামু, উখিয়া ও টেকনাফে একাধিক বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রামুর পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফে সাতটি বৌদ্ধ বিহার ও ১১টি বসতঘরেও হামলার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক বসতঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও বসতঘরগুলো পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও অনেকটা ফিরে এসেছে। তবে হামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে এখনো সংশয় ও হতাশা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। তাঁদের কেউ কেউ প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে মামলাগুলোর পুনঃতদন্তের দাবিও জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনায় মোট ২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাদীর সম্মতিতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত ৩৭৮ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ হাজার ১৮২ জনকে আসামি করা হয়। পুলিশ ৯৩৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ শীলপ্রিয় মহাথের বলেন, ২০১২ সালের সহিংসতার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা সঠিক বিচার পাননি। বর্তমান সরকারের কাছে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সঠিক বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিচারের নামে কোনো নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় ছাত্রনেতা মোহাম্মদুল হক জনি বলেন, রামুর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে আসছেন। তাঁর ভাষ্য, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে যে হামলা হয়েছিল, তার সঙ্গে জড়িতদের বিচার এখনো হয়নি। নির্বাচিত সরকারের কাছে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

আইনজীবী শিপ্ত বড়ুয়া বলেন, রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বসতিতে হামলার ১৪ বছর পরও তাঁদের বিচার চাইতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, হামলার সময়কার ছবি ও ভিডিওচিত্রকে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে সাক্ষীর অভাবে বিচারকাজ থেমে থাকার কথা শোনা গেছে।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ১৪ বছরে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে এলেও মামলাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তাঁর দাবি, পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দিলেও এখনো কোনো মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। রামুর ১৮টি মামলার বাদী পুলিশ হওয়ায় কারা আসামি হয়েছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, সে বিষয়েও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে পরিষ্কার তথ্য নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু আরও বলেন, হামলার সময় যারা সামনে থেকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অনেকের নাম অভিযোগপত্রে নেই বলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঠেকাতে রামু হামলার একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. ইউনুছ জানান, রামুর ঘটনায় দায়ের করা ১৮টি মামলার মধ্যে ১১টির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। উখিয়ার চারটি মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে তিনি জানান। বাকি তিনটি মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি তাঁর জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মামলাগুলোর বিচার ধীরগতির হওয়ার কারণ হিসেবে মো. ইউনুছ দাবি করেন, আগের সরকারের হস্তক্ষেপে নিরপরাধ বিএনপি ও জামায়াতের লোকজনকে আসামি করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, এ কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ চললেও সাক্ষীরা নিয়মিত আদালতে আসছেন না এবং এতে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মামলার নথি ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হওয়ার বিষয়।

এদিকে রামু ট্র্যাজেডির ১৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে রামু বুড্ডিস্ট সোশ্যাল মুভমেন্ট বাংলাদেশ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বুদ্ধ উপাসনা, পতাকা উত্তোলন, অষ্টশীল গ্রহণ, চিত্রাঙ্কন ও চিত্র প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী।

স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিহারগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হলেও ঘটনার পূর্ণ বিচার না হলে তাঁদের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে রামুর বৌদ্ধ বিহারগুলোতে সরকারি নিরাপত্তা আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এই শাখার আরও খবর

বিশ্বজুড়ে স্কুলে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশে কী করবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাড়ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমে যাওয়া, সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং অতিরিক্ত…

কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, চাপে বাংলাদেশসহ চার দেশ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। এর মধ্যে কাতার…

শেষ মুহূর্তের গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে শীর্ষে ফ্রান্স

বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচজুড়ে দাপট দেখিয়েও গোলের দেখা পাচ্ছিল না ফ্রান্স। একের পর এক আক্রমণ, কয়েকটি সহজ সুযোগ এবং ক্রসবারে বল লাগার পরও কাঙ্ক্ষিত গোলটি আসছিল…

মধ্যরাতেও বিক্ষোভে উত্তপ্ত চুয়েট

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার…

বাংলাদেশি পাটপণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা ভারতের

বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর নতুন করে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৪ সেপ্টেম্বরের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৩৬টি বাংলাদেশি পাটপণ্য…

জামায়াতের উত্থান দেশকে ধর্মযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে: নুরুল হক নূর

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশকে ধর্মযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং দেশের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au