ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা: বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি বন্ধের নেপথ্য রাজনীতি
ইতিহাস কোনো নিছক কালপঞ্জি বা অতীতের মৃত দলিল নয়; ইতিহাস হলো একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দর্পণ, অস্তিত্বের মূল শেকড়। সেই শেকড়েই যখন কুঠারাঘাত করা হয়, তখন…
নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এক সাংবাদিক বলেছেন, দেশ থেকে দূরে থাকলেও সাংবাদিকতা থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। ইউরোপীয় সেন্টার ফর প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া ফ্রিডমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা, হুমকি ও চাপ, দেশ ছাড়ার পরিস্থিতি এবং নির্বাসিত জীবনের মানসিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষাৎকারে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ওই সাংবাদিকের ভাষ্য, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে প্রকাশিত চিত্রের চেয়েও কঠিন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাংবাদিকের জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয় সবসময় তথ্য সংগ্রহ বা প্রতিবেদন লেখা নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই ঝুঁকি তৈরি হয়।
তার দাবি, সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়া, সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়া, ছবি মুছে ফেলা, সরাসরি হামলা, ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। গুরুতর কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি ও হামলার প্রসঙ্গে তিনি মানবাধিকার সহায়তা সংস্থার তথ্য তুলে ধরেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৮৩ জন সাংবাদিক হয়রানি, হামলা বা ভয়ভীতির শিকার হয়েছেন। একই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৩৩ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, ঢাকার বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকরা কখনো কখনো যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের সেই সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। তার দেওয়া জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের ওপর নথিভুক্ত ঘটনার ৯১ শতাংশই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ঘটেছে।
তবে তার মতে, এসব পরিসংখ্যানের বাইরেও একটি বড় বাস্তবতা রয়েছে। কোনো সাংবাদিক সম্ভাব্য হামলা, হুমকি বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় কোনো প্রতিবেদন লেখা থেকে বিরত থাকলে, কোনো সূত্র ভয় পেয়ে কথা না বললে কিংবা কোনো সম্পাদক ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিবেদন প্রকাশ না করলে তা সাধারণত কোনো পরিসংখ্যানে উঠে আসে না।
বাংলাদেশের আইনগত পরিবেশ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। তার মতে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা ও মানহানির মতো বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকৃত সাইবার অপরাধ এবং বৈধ সাংবাদিকতা, সমালোচনা ও জনস্বার্থের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকা দরকার।
ডিজিটাল নিরাপত্তাকেও সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকরা হ্যাকিং, নজরদারি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে দেওয়া এবং সমন্বিত অনলাইন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সাংবাদিককে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করা হলে অনলাইন হয়রানি দ্রুত বাস্তব জীবনের ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে বলেও তিনি জানান।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ওই সাংবাদিক জানান, ২০২৩ সালের কয়েকটি ঘটনার পর তাকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাড়তে হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বছরের ১৪ এপ্রিল ঢাকার একটি হোটেলে গবেষণা প্রকল্পসংক্রান্ত বৈঠকের কথা বলে তাকে ডাকা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তার ফোন নিয়ে তাকে হোটেল এলাকা থেকে জোর করে নিয়ে যান।
ওই সাংবাদিকের দাবি, ওই ব্যক্তিরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিদেশি ও কূটনীতিকদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে তাকে নজরদারিতে রাখার কথাও জানিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ এবং প্রকাশ্য ও সমালোচনামূলক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার জন্য তাকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আইনজীবী এবং নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেন বলে জানান। তবে কারা ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল, তা নিশ্চিত হতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি। ২০২৩ সালের ৭ মে একজন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই রাষ্ট্রদূত তাকে নিরাপত্তার জন্য ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এর পরদিন ৮ মে তাকে অপহরণ করা হয় বলে সাক্ষাৎকারে দাবি করেন ওই সাংবাদিক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই থেকে তিন দিন তিনি প্রায় পুরোপুরি বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। শারীরিকভাবে দুর্বল ও আতঙ্কিত অবস্থায় থাকার ওই অভিজ্ঞতা তার কাছে ঝুঁকির বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এরপর তিনি বুঝতে পারেন, পেশাগত হুমকি শারীরিক এবং প্রাণঘাতী ঝুঁকিতেও রূপ নিতে পারে।
দেশ ছাড়ার পরও ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, মানহানিকর বক্তব্য, অনলাইন প্রচারণা এবং পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হয়েছে বলেও জানান। তার দাবি, এসব ঘটনার জন্য এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি এবং কোনো তদন্তও শুরু হয়নি।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও জানান তিনি। ১৯৯৫ সালে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সাময়িকীতে কাজের মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন বলে জানান। পরে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তৃণমূল সাংবাদিকতায় বেশি মনোযোগ দেন এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করেন।
তিনি জানান, প্রান্তিক মানুষের কথা জাতীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরতে ‘রুরাল ফিচার সার্ভিস’ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘জনতথ্যঘর’ নামে একটি তথ্যকেন্দ্র পরিচালনা করেন। তার মতে, প্রান্তিক মানুষ শুধু তথ্যের বিষয় হবে না, তারাও তথ্য তৈরির প্রক্রিয়ার অংশীদার হওয়া উচিত।
তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন বলে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের পক্ষে তিনি কাজ করেন। তিনি মনে করেন, তথ্য পাওয়ার অধিকার শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নিজের উদ্বেগের কথা জানান ওই সাংবাদিক। তার মতে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েও সাংবাদিকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষ্য, সরকার পরিবর্তন হলেও সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টির কিছু কাঠামো পুরোপুরি বদলায়নি। ডিজিটাল নজরদারি, শারীরিক হামলা, আইনি হয়রানি, রাজনৈতিক বিরোধ, জনতার ভয়ভীতি এবং উগ্রপন্থী চাপ একসঙ্গে সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও আত্মসংযমের পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টির এই কাঠামোগুলো ভেঙে নিরাপদে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু কোনো একটি সরকারের সময়ে নয়, সব সরকারের সময়ই সুরক্ষিত থাকা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকের প্রসঙ্গও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম এবং বাংলাদেশের স্কোর ৩৩ দশমিক ০৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার মানসিক প্রভাব নিয়েও কথা বলেছেন ওই সাংবাদিক। তিনি জানান, স্ত্রী ও মেয়ের কাছ থেকে দূরে থাকা তার জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি। দেশ ছাড়ার পর ঘুমের সমস্যা, লেখার ক্ষেত্রে অনীহা, স্মৃতির বিভিন্ন সমস্যা এবং হঠাৎ আতঙ্কের মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একসময় দেশে ফিরতে পারবেন বলে আশা করেছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে সেই আশা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তার মতে, নির্বাসনের কষ্টের বড় অংশ হলো পরিবারের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকা।
মানসিক চাপ মোকাবিলায় চিকিৎসা ও সহায়তা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তার মতে, সাংবাদিকদের মানসিক সুস্থতাকে পেশাগত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা হুমকির প্রভাব শুধু শারীরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তার কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া অন্য সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি সাংবাদিক সংগঠন ও পেশাগত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, দেশ থেকে দূরে থাকলেও লেখা, গবেষণা, প্রতিবেদন বা অন্য কোনো মাধ্যমে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বিপদের আগে থেকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা উচিত। একই সঙ্গে অনলাইন হুমকিকে শুরু থেকেই গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে দ্রুত মানসিক সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সবশেষে ওই সাংবাদিক বলেন, নিরাপত্তার কারণে দেশ ছেড়ে যাওয়া সাংবাদিকতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়। একজন সাংবাদিক অন্য দেশ থেকেও কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, যদিও কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। তার ভাষায়, সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বেঁচে থাকা পেশা থেকে সরে যাওয়া নয়, বরং এই পেশারই একটি শর্ত।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au