ফরিদপুরে মাদ্রাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক আটক
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ১৩ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে কারী মো. মাসুদ (২৭) নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেল পৌনে ৫টার…
এবছরের শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। টাঙ্গাইল, পঞ্চগড়, সিলেট ও রাজবাড়ীতে নির্মাণাধীন বা পূজার জন্য প্রস্তুত করা প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোনো ঘটনায় রাতের আঁধারে মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে, আবার কোনো ঘটনায় পূজামণ্ডপে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রতিমায় আঘাত করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে একজন। এ যেন উৎসবের আগে আরেক উৎসব। প্রতিমা ভাঙচুরের উৎসব।
এসব ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। দুর্গাপূজার মতো বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের আগে মন্দির ও প্রতিমার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্গাপূজার আগে এমন ঘটনাগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
৩০ সেপ্টেম্বর, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর: নির্মাণাধীন সাত প্রতিমা ভাঙচুর
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দুর্গামন্দিরে নির্মাণাধীন সাতটি প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের জামুর্কী পশ্চিমপাড়া এলাকায় রাধাগোবিন্দ মন্দিরসংলগ্ন আর্য সমিতির দুর্গামন্দিরে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামুর্কী আর্য সমিতির আয়োজনে প্রায় ৮৫ বছর ধরে ওই মন্দিরে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। চলতি বছরও সেখানে পূজার আয়োজন করা হয়। মন্দিরে দুর্গা প্রতিমাসহ সাতটি প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছিল। রং করার কাজ ছাড়া প্রতিমাগুলোর নির্মাণকাজের প্রায় সবই শেষ হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, বুধবার রাতে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা মন্দিরে প্রবেশ করে প্রতিমাগুলো ভাঙচুর করে। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়রা বিষয়টি দেখতে পান। খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
ঘটনার পর টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার এবং সহকারী পুলিশ সুপার মো. আদনান মুস্তাফিজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ জানিয়েছে, জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা জোরদার করার কথা জানানো হয়েছে।
জামুর্কী আর্য সমিতির সভাপতি প্রকাশ বাকালী বলেন, তারা ঘটনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারা জড়িত এবং তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
২৬ সেপ্টেম্বর, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ: মহিষ ও ময়ূরের অংশ ভাঙচুর
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় নির্মাণাধীন দুর্গাপ্রতিমার দুটি অংশ ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া যায়। ঘটনাটি ঘটে ২৬ সেপ্টেম্বরের ভোররাতে উপজেলার দেবীদুবা ইউনিয়নের গালান্ধি চৌরঙ্গী শ্রীশ্রী দুর্গা মন্দিরে।
স্থানীয় বাসিন্দা দুজয় চন্দ্র মানিকের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের আঁধারে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নির্মাণাধীন প্রতিমার মহিষ ও ময়ূরের অংশ ভেঙে রেখে যায়। সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মুসা মিয়া জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক রাধানাথ বর্মন এ ঘটনায় থানায় মামলা করেন।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় নির্মাণাধীন দুর্গাপ্রতিমার দুটি অংশ ভাঙচুর। ছবিঃ সংগৃহীত
পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে পুরোহিত ও কারিগররা চলে যাওয়ার পর রাত ১২টার পর মণ্ডপে কেউ না থাকার সুযোগে ভাঙচুর করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইসহ তদন্ত চলছে।
এ ঘটনায় এখনো হামলাকারী শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
২১ সেপ্টেম্বর, রাজবাড়ীর বানিবহ: প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর
রাজবাড়ীর সদর উপজেলার বানিবহ ইউনিয়নের বড়বাজার দুর্গামণ্ডপে নির্মাণাধীন দুর্গা ও সরস্বতী প্রতিমার মুখমণ্ডল ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে ২১ সেপ্টেম্বর রাতে।
মণ্ডপসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের কোনো একসময় প্রতিমা দুটির মুখে আঘাত করা হয়। পরদিন বিষয়টি তাদের নজরে আসে। মণ্ডপের সভাপতি অরুণ কুন্ডু জানান, ঘটনার সময় মণ্ডপের বাইরে তালা লাগানো ছিল। প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত করার ধরন দেখে বাইরে থেকে লাঠি জাতীয় কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বড়বাজারের ওই পূজামণ্ডপে প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। ফলে দীর্ঘদিনের একটি ধর্মীয় উৎসবস্থানে পূজার আগে প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে। তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
রাজবাড়ী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহ্বায়ক অশোক সরকার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
২০ সেপ্টেম্বর, সিলেটের বালাগঞ্জ: মণ্ডপে ঢুকে বটি দিয়ে প্রতিমায় কোপ
সিলেটের বালাগঞ্জে দুর্গাপূজার মণ্ডপে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগে সাইদুজ্জামান শিমুল নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঘটনাটি ঘটে ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বালাগঞ্জ পশ্চিম বাজার নবীনগর সার্বজনীন পূজামণ্ডপে।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুদীপ পালের অভিযোগ, শিমুল মণ্ডপে ঢুকে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের প্রতিমার বিভিন্ন অংশে বটি দিয়ে আঘাত করেন। খবর পেয়ে মন্দির কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে খবর দেন।

সিলেটের বালাগঞ্জে দুর্গাপূজার মণ্ডপে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর। ছবিঃ সংগৃহীত
পুলিশ শিমুলকে আটক করে এবং তার কাছ থেকে একটি বটি উদ্ধার করার কথা জানায়। পরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা করা হয়। আদালতে পাঠানো হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এই ঘটনার উদ্দেশ্য নিয়ে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন তথ্যও সামনে এসেছে। শিমুলের পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে দীর্ঘদিনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশও জানিয়েছে, তার মানসিক অবস্থার বিষয়টি আদালতের বিবেচনার বিষয়। ফলে এ ঘটনাকে সরাসরি সংগঠিত সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে তদন্তের ফলাফল বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজবাড়ীর আরেক ঘটনায় ভিন্ন চিত্র
রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দা মধ্যপাড়া সর্বজনীন দুর্গামন্দিরেও প্রতিমার মুখ ও হাত ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভোররাতে এ ঘটনা ঘটে এবং পরে প্রতিমা মেরামত শুরু করা হয়।
প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে
দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে আসায় পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় মণ্ডপে লোকজন না থাকার সুযোগে নির্মাণাধীন প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ কয়েকটি ঘটনায় এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু ঘটনা ঘটার পর তদন্ত নয়, পূজার আগে মন্দির ও মণ্ডপগুলোর ঝুঁকি চিহ্নিত করে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা জোরদারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। পুলিশ স্টেশনগুলোকে মণ্ডপভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা ও যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা ও সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রতিমা ভাঙচুরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জরুরি
সংখ্যালঘু অধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্মীয় পরিচয় বা উদ্দেশ্য যাই হোক, কোনো উপাসনালয়, ধর্মীয় প্রতীক বা প্রতিমায় হামলা নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে একটি বড় ধর্মীয় উৎসবের আগে এমন ঘটনা স্থানীয় একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অনিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
দুর্গাপূজা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। উৎসবটি যাতে ভয়, আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পালিত না হয়, সে দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়, সমাজের সব সম্প্রদায়েরও। ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গেও যুক্ত।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au