এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না দোকানে, বেশি দামে মিলছে ডিলারের কাছে।
বরিশাল নগরীতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডারের। খুচরা দোকানগুলোতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত টাকা দিলে ডিলারের মাধ্যমে সিলিন্ডার সংগ্রহ করা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতারা। সংকটের কারণে বরিশালের অনেক ক্রেতাকে স্বাভাবিক দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকালে নগরীর নিউ সার্কুলার রোড এলাকার বাসিন্দা সাদেক খালি সিলিন্ডার নিয়ে বটতলা বাজারে যান। একটি দোকানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি গ্যাসের সিলিন্ডার পাননি। পরে আরও চার থেকে পাঁচটি দোকানে খোঁজ করেও কোথাও গ্যাস না পেয়ে বিপাকে পড়েন তিনি।
একপর্যায়ে তিনি সুমন নামের এক দোকানির কাছে গ্যাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। দোকানি জানান, গত দুই মাস ধরে তারা নিয়মিতভাবে গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। মাঝে মাঝে কোনো কোনো কোম্পানি এক বা দুটি সিলিন্ডার সরবরাহ করলেও দোকানে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ক্রেতারা সেগুলো নিয়ে যাচ্ছেন।
সাদেকের অনুরোধে সুমন ডিলারের একজন ম্যানেজারের কাছে ফোন করে একটি সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। ফোনে কথা বলার পর তিনি জানান, অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে। কিছুক্ষণ পর ডিলারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি সিলিন্ডারের জন্য ১ হাজার ৮০০ টাকা দিতে হবে। সাদেক এতে রাজি হলে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে রিকশায় করে একটি সিলিন্ডার দোকানে পৌঁছে দেওয়া হয়। রিকশাচালক ভাড়াসহ ১ হাজার ৮০০ টাকা নিয়ে সিলিন্ডারটি দিয়ে যান এবং সাদেকের খালি সিলিন্ডারটি সঙ্গে নিয়ে যান।
এ ঘটনার সময় সুমনের কাছে আরও এক ক্রেতা ফোন করে গ্যাসের সিলিন্ডার চান। তাকেও দোকানি জানান, তার কাছে কোনো সিলিন্ডার নেই। তবে বিভিন্ন দোকানে খোঁজ করে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন। পরে কর্মচারীকে অন্য একটি দোকানে পাঠিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। এরপর ডিলারের লোকজনের কাছে একাধিকবার ফোন করেন সুমন। কিন্তু সেখান থেকেও ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এভাবে গ্যাস না দিলে আর তাদের কাছ থেকে গ্যাস নেবেন না।
খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, বটতলা বাজারের চিত্রটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা এলপিজি বিক্রেতাদের কাছেই একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ক্রেতারা দোকানে দোকানে ঘুরেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিলারের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এভাবে স্বাভাবিক দামের তুলনায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
যেসব পরিবারের রান্নার জন্য এলপিজি ছাড়া অন্য কোনো জ্বালানির ব্যবস্থা নেই, তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। গ্যাস না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। একইভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ভাসমান খাবার ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে। তাদের অনেককে একটি সিলিন্ডারের জন্য তিন থেকে চারটি বাজার ঘুরতে হচ্ছে।
সদর রোডের চা দোকানি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গ্যাস না থাকলে তার দোকান বন্ধ রাখতে হবে। একদিন দোকান বন্ধ থাকলেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে তিনি ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে বড় বাজার থেকে একটি গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করেছেন। নগরীর আমতলা এলাকার একাধিক ভাসমান ব্যবসায়ীও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাবাজারের মুদি দোকানি মোহাম্মদ আজিম বলেন, প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন ক্রেতা তার দোকানে সিলিন্ডারের জন্য আসেন। কিন্তু গ্যাস না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হয়। যেসব ক্রেতার মোবাইল নম্বর রয়েছে, তারা পরে ফোন করে গ্যাসের জন্য অনুরোধ করেন।
মোহাম্মদ আজিম জানান, গত সাত দিনে তিনি মাত্র তিনটি গ্যাস সিলিন্ডার পেয়েছেন। একাধিক ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেশি দাম দিতে রাজি হলে আবার তাদের মাধ্যমেই সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একাধিক খুচরা বিক্রেতার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওমেরা, যমুনা, বসুন্ধরা, আই গ্যাস, নাভানা, ফ্রেশ, ইউনিক, বেক্সিমকো ও পেট্রোম্যাক্সের ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে এলপিজি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে কিছু কোম্পানি এক বা দুটি করে সিলিন্ডার সরবরাহ করলেও চাহিদার তুলনায় তা খুবই কম।
ফলে একদিকে খুচরা বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এতে সাধারণ পরিবার থেকে শুরু করে চা দোকানি ও ভাসমান খাবার ব্যবসায়ী পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন।