বাংলাদেশ

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস

  • 1:34 pm - October 05, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৯৫ বার
বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ছবি : সংগৃহীত

শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, একজন শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলেন। একটি শিশুর জীবনের পথচলায় মা-বাবার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিক্ষক। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে এত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পরও দেশের অনেক শিক্ষক এখনো আর্থিক অনিশ্চয়তা, পেশাগত বঞ্চনা ও নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রচলিত একটি কথা রয়েছে, মোমবাতি নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেয়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও কথাটি অনেকাংশে সত্য। একজন শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দেন, তার ভেতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেন। একটি শিশুর যে সম্ভাবনা তার পরিবারও হয়তো দেখতে পায় না, একজন শিক্ষক অনেক সময় সেই সম্ভাবনা সবার আগে চিনতে পারেন।

শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়। বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে শেখার আগ্রহ তৈরি করাই তার অন্যতম বড় দায়িত্ব। যে শিক্ষার্থী পড়াশোনায় পিছিয়ে, তার মধ্যে শিক্ষক হয়তো গল্প বলার প্রতিভা খুঁজে পান। যে শিক্ষার্থী সবার সামনে কথা বলতে ভয় পায়, তাকেই শিক্ষক একদিন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের নাম বলতে শেখান। এমন ছোট ছোট মুহূর্তই অনেক সময় একজন মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।

একজন ভালো শিক্ষক একই সঙ্গে পথপ্রদর্শক, উপদেষ্টা, অভিভাবকের মতো ভরসার জায়গা এবং বন্ধুর মতো একজন শ্রোতা। গ্রামের কোনো স্কুলের একজন শিক্ষার্থী কয়েক দিন ধরে স্কুলে না এলে শিক্ষক যদি তার খোঁজ নিতে বাড়ি পর্যন্ত যান, তাহলে তিনি হয়তো সেই শিশুকে ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করেন। এ ধরনের কাজের জন্য কোনো পুরস্কার বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না মিললেও সমাজের ভিত শক্ত হয় এভাবেই।

একজন মানুষ কেমন হবে, তার ওপর শৈশবে পাওয়া শিক্ষা ও পরিবেশের বড় প্রভাব থাকে। মা-বাবার পর শিক্ষকের আচরণও শিশুর ওপর গভীর ছাপ ফেলে। শিক্ষক যদি সময়মতো শ্রেণিকক্ষে আসেন, কথা দিলে তা রাখেন এবং নিজের ভুল স্বীকার করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা অজান্তেই সময়ানুবর্তিতা, সততা ও বিনয়ের মতো মূল্যবোধ শিখে নেয়। একইভাবে শিক্ষকের নেতিবাচক আচরণও শিক্ষার্থীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

একটি সমাজ কতটা সহনশীল, ন্যায়বোধসম্পন্ন ও মানবিক হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই সমাজের মানুষ কীভাবে গড়ে উঠছে তার ওপর। আর মানুষ গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান কারিগর হলেন শিক্ষক। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখান, তারাই ভবিষ্যতে মতের অমিলকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় না গিয়ে আলোচনার পথ বেছে নিতে পারে। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা আর্থিক অবস্থার কারণে কাউকে ছোট না করার শিক্ষাও শ্রেণিকক্ষ থেকেই তৈরি হয়।

বর্তমান সময়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। মুঠোফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডেই পাওয়া যাচ্ছে অসংখ্য তথ্য। কিন্তু তথ্য, জ্ঞান ও বিবেক এক বিষয় নয়। একজন মানুষ অনেক কিছু জানার পরও নিষ্ঠুর, দুর্নীতিবাজ বা স্বার্থপর হতে পারেন। তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল, ডিগ্রি অর্জন কিংবা চাকরি পাওয়া হতে পারে না। শিক্ষার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চাও জরুরি।

মূল্যবোধ শুধু বক্তব্য দিয়ে শেখানো সম্ভব নয়। দয়া, সততা, দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের প্রতি স্নেহ একজন শিক্ষার্থী বাস্তব পরিবেশ ও মানুষের আচরণ দেখে শেখে। পরীক্ষার হলে নকলের সুযোগ না দেওয়া শিক্ষক যেমন সততার শিক্ষা দেন, তেমনি একজন শিক্ষক যদি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রধান শিক্ষক পর্যন্ত সবাইকে সমান সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলেও শিক্ষার্থীরা মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পায়।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উন্নয়নে অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষার পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, নার্স, আইনজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা বিজ্ঞানী, প্রত্যেকের পেছনেই কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান রয়েছে। তাই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ ও মানবিক সম্পদে পরিণত করার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব শিক্ষকদের ওপর।

কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও দেশের অনেক শিক্ষক চাকরির খাতায় কেবল একজন কর্মচারী হিসেবেই বিবেচিত হন। সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক আর্থিক সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। বেতন-ভাতার দাবিতে অনেক সময় তাদের রাস্তায় নামতে হয়। আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে অনেক শিক্ষককে প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে শিক্ষক ধীরে ধীরে শিক্ষাদাতা থেকে সেবাদাতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। এর দায় শুধু শিক্ষকের নয়, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা শিক্ষা ব্যবস্থারও দায় রয়েছে।

শিক্ষকতা পেশায় আরও রয়েছে নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব, দলীয় প্রভাব, বদলিতে তদবির এবং প্রশিক্ষণের নামে নানা আনুষ্ঠানিকতার মতো সমস্যা। আবার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন অনিয়মে কিছু শিক্ষকের নাম জড়িয়ে পড়লে পুরো শিক্ষকতা পেশাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ধরে রাখতে শিক্ষকদেরও জবাবদিহি, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শিক্ষা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নতুন পাঠ্যক্রম, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ ও নতুন শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলা হলেও এসব বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব শিক্ষকদেরই নিতে হয়। অথচ নতুন পদ্ধতিতে পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সময় না দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু বই বা পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করলেই শিক্ষার আধুনিকায়ন সম্ভব নয়। শিক্ষকদেরও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে তুলতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উপকরণ, সম্মানজনক বেতন ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটি কোনো করুণা বা অনুগ্রহ নয়, বরং একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মৌলিক শর্ত।

শিক্ষকতা পেশাকে মেধাবী তরুণদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলাও জরুরি। বর্তমানে অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় থাকেন। কারণ একদিকে রয়েছে আয় ও চাকরির অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সামাজিক মর্যাদার অভাব। যেদিন দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণেরা স্বেচ্ছায় শিক্ষকতাকে তাদের প্রথম পছন্দের পেশা হিসেবে বেছে নেবেন, সেদিনই বোঝা যাবে শিক্ষকতা পেশাকে আমরা সত্যিকার অর্থে কতটা মর্যাদা দিতে পেরেছি।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়। শিক্ষকদের বঞ্চনা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যারা তৈরি করেন, তাদের জীবন ও পেশার মান উন্নত না করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এই শাখার আরও খবর

আসন্ন বড় খাদ্য সংকটের জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ, জ্বালানি ও সার সরবরাহে চাপ,…

‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই’

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানার এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের…

ছেলেকে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় বাবাকেও গুলি করে হত্যা

খুলনার রূপসা উপজেলায় ছেলে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় তার বাবা আক্তার ঢালীকেও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে মাগরিবের…

ইতিহাসের মহানায়ক: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

কেউ কেউ ইতিহাসে স্থান করে নেন; আবার কেউ এমনভাবে একটি জাতির জীবনে আবির্ভূত হন, যাঁকে বাদ দিয়ে সেই জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিই লেখা যায়…

অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভাঙল ফারুকী-তিশার সংসার?

শোবিজ অঙ্গনের জনপ্রিয় দম্পতি নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সংসারে ভাঙনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় তিশার নামে থাকা একটি বাড়ি বিক্রি…

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তারেকের ভারত সফর কি একই সূত্রে গাঁথা?

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবি এবং বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক নতুন করে জটিল হয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au