আসন্ন বড় খাদ্য সংকটের জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ, জ্বালানি ও সার সরবরাহে চাপ,…
কেউ কেউ ইতিহাসে স্থান করে নেন; আবার কেউ এমনভাবে একটি জাতির জীবনে আবির্ভূত হন, যাঁকে বাদ দিয়ে সেই জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিই লেখা যায় না। কেউ যখন দাঁড়ান, তখন শুধু একজন মানুষ দাঁড়ান না—তাঁর সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায় লক্ষ-কোটি মানুষের স্বপ্ন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমনি এক ইতিহাসের মহানায়ক।
বিনম্র শ্রদ্ধা আর গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করছি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে; স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডে নিহত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান ও পুত্রবধূসহ তাঁর পরিবারের সদস্য, স্বজন এবং অন্য শহিদদের। মহান আল্লাহ তাঁদের সবাইকে ক্ষমা করুন, বেহেশত নসিব করুন। আমিন।
টুঙ্গিপাড়ার ‘খোকা’ থেকে বাঙালির বঙ্গবন্ধু
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের ঘরে জন্ম নেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরিবারের আদরের নাম ছিল ‘খোকা’। শৈশবের সেই খোকা একদিন বাংলা ও বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রধান কণ্ঠে পরিণত হবেন—এ কথা তখন কে জানত! কিন্তু কৈশোর থেকেই মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অন্যায় ও বৈষম্যের প্রতি তাঁর সহজাত সংবেদনশীলতা ছিল চোখে পড়ার মতো। স্কুলজীবনেই তিনি সহপাঠীদের সংগঠিত করেছেন, স্থানীয় মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন এবং অন্যায়ের মুখে নীরব না থাকার মানসিকতা দেখিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে বুঝতে হলে একটি বিষয় মনে রাখতে হয়—শেখ মুজিব কোনো প্রস্তুত মঞ্চে নেতা হয়ে ওঠেননি। দীর্ঘ সংগ্রাম, সংগঠন, জেল-জুলুম, জনসংযোগ এবং মানুষের আস্থার মধ্য দিয়ে তিনি নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছেন। কলকাতার ছাত্ররাজনীতি থেকে পাকিস্তান-পরবর্তী পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলন—প্রতিটি পর্যায়েই তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার।
ভাষার অধিকার থেকে স্বাধিকারের সংগ্রাম
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অধিকার পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোয় সমমর্যাদা পাচ্ছে না। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে শেখ মুজিব সক্রিয় ভূমিকা নেন এবং ১১ মার্চের কর্মসূচিতে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়েও তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান বজায় রাখেন। ভাষার প্রশ্ন তাঁর কাছে কেবল ভাষাগত মর্যাদার বিষয় ছিল না; এটি ছিল আত্মপরিচয়, অধিকার ও রাজনৈতিক সমতার প্রশ্ন। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে কারাবন্দি অবস্থায়ই শেখ মুজিব যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে সভাপতি হন। সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর অসাধারণ যোগাযোগক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। তিনি মানুষের বাড়িতে গেছেন, হাটে-বাজারে কথা বলেছেন, শ্রমিকের দাবি শুনেছেন, কৃষকের অভাব বুঝেছেন। এ কারণেই তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি—তা মানুষের মুখের ভাষায় পরিণত হয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার। ছবি: সংগৃহীত
ছয় দফা: বাঙালির মুক্তির সনদ
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই ছয় দফা কার্যত বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি ছিল চ্যালেঞ্জ; বাঙালির কাছে এটি হয়ে ওঠে মুক্তির সনদ। ছয় দফা নিয়ে তিনি সারা বাংলায় গণসংযোগ করেন এবং বারবার গ্রেপ্তার হন। রাষ্ট্রীয় দমন যত বেড়েছে, মানুষের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও তত বেড়েছে। পরবর্তীতে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করা হয়। কিন্তু ইতিহাস অন্য পথে এগোয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে মামলা প্রত্যাহার হয় এবং তিনি মুক্তি পান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে গণসংবর্ধনায় ছাত্র-জনতা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। পরিবারের খোকা তখন আর শুধু একটি পরিবারের সন্তান নন; তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালির বঙ্গবন্ধু।
সত্তরের গণরায়: এক নেতার পেছনে একটি জাতি
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক পরীক্ষা। তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬২টি সাধারণ জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়লাভ করে এবং সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট ১৬৭টি আসন অর্জন করে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার ছিল আওয়ামী লীগের। কিন্তু সেই গণরায় মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণার পর পূর্ব বাংলা বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। প্রশাসন, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবখানে তাঁর নির্দেশনা কার্যত রাজনৈতিক কর্তৃত্বে রূপ নেয়। তখন দৃশ্যটি ছিল অভূতপূর্ব: একজন নির্বাচিত নেতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে না পেয়েও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে গোটা ভূখণ্ডের রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি—মানুষের আস্থা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবিঃ সংগৃহীত
৭ মার্চ: একটি ভাষণ, একটি জাতির প্রস্তুতি
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার প্রস্তুতির অনন্য দলিল। তিনি একদিকে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ও নির্দেশনা দেন, অন্যদিকে জাতিকে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন। ভাষণটি কেবল আবেগের বিস্ফোরণ ছিল না; ছিল রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কৌশল, সংগঠন এবং জনমনের গভীর উপলব্ধির অসাধারণ সমন্বয়। বঙ্গবন্ধুর ভাষার শক্তি ছিল তার সরলতায়। তিনি এমন ভাষায় কথা বলতেন যা কৃষক বুঝতেন, শ্রমিক বুঝতেন, ছাত্র বুঝতেন, সরকারি কর্মচারী বুঝতেন—সমস্ত বাঙালি নিজের কথা খুঁজে পেত। ২০১৭ সালে UNESCO বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘Memory of the World International Register’-এ অন্তর্ভুক্ত করে। একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে অল্প কয়েক মিনিটে এমন শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষায় ধারণ করার উদাহরণ বিশ্ব ইতিহাসেও বিরল।
বন্দি বঙ্গবন্ধু, যুদ্ধরত বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তাঁকে বন্দি করা গেলেও তাঁর নেতৃত্বে জেগে ওঠা জাতিকে আর বন্দি রাখা সম্ভব হয়নি। ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করে; পরে স্থানটির নাম হয় মুজিবনগর। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অগণিত শহিদের আত্মত্যাগ এবং মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বাধীন স্বদেশে ফিরে আসেন। সেদিন ঢাকায় যে জনসমুদ্র সৃষ্টি হয়েছিল, তা ছিল একজন নেতার দেশে ফেরা নয়—ছিল স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধারণ করা এক প্রতীকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। যাঁকে পাকিস্তান রাষ্ট্র বিচারের মুখোমুখি করেছিল, তিনিই ফিরে এলেন স্বাধীন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে।
ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র নির্মাণের কঠিন অধ্যায়
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল এমন একটি দেশ, যার অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত, প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল এবং লাখো মানুষ যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে। শরণার্থীদের পুনর্বাসন, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠন, খাদ্যসংকট মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো—সবকিছু একসঙ্গে করতে হয়েছে। স্বাধীন দেশ পরিচালনা তাঁর জন্য ছিল নতুন সংগ্রাম; আর সে সংগ্রামের সময় তিনি পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছরের মতো। এই স্বল্প সময়ে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ছিল একটি ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুদ্ধশেষে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর দ্রুত প্রত্যাহার, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন আয়োজন, নতুন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বৈদেশিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুর সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে এবং একই বছর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন। সদ্য স্বাধীন একটি দেশের নেতা বিশ্বমঞ্চে মাতৃভাষায় কথা বলছেন—এ দৃশ্য ছিল ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত বাঙালির দীর্ঘ যাত্রার প্রতীকী পূর্ণতা। বাংলা ভাষা, বাঙালির আত্মপরিচয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র—তাঁর জীবনের তিনটি বড় সংগ্রাম যেন সেই মুহূর্তে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল।
রাষ্ট্রনায়কের ভেতরে যে মানুষটি ছিলেন
রাজনীতির বিশাল ক্যানভাসের বাইরে বঙ্গবন্ধুর আরেকটি পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন গভীরভাবে পরিবারমুখী এবং আবেগপ্রবণ একজন মানুষ। তাঁর দীর্ঘ কারাজীবনের কারণে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন কাটানোর সুযোগ খুব কমই হয়েছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব শুধু তাঁর জীবনসঙ্গী নন, রাজনৈতিক সংগ্রামের নীরব সহযাত্রীও ছিলেন। সংসারের দায়িত্ব সামলানো, সন্তানদের বড় করা, বিপদের সময়ে সাহস দেওয়া এবং রাজনৈতিক সংকটে দৃঢ় থাকা—বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রামের পেছনে বঙ্গমাতার অবদান অনস্বীকার্য। এই পারিবারিক ত্যাগের ইতিহাসও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীমূলক লেখাগুলো পড়লে একদিকে দৃঢ় রাজনৈতিক নেতাকে যেমন দেখা যায়, অন্যদিকে দেখা যায় মানুষের কষ্টে বিচলিত, সন্তানদের জন্য ব্যাকুল এবং দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতাসম্পন্ন এক ব্যক্তিকে। তাঁর রাজনীতিতে ‘মানুষ’ শব্দটি কেবল বক্তৃতার অলংকার ছিল না। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ, কৃষকের ন্যায্য অধিকার, শ্রমিকের মর্যাদা এবং সাধারণ বাঙালির আত্মসম্মান—এসব তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। হয়তো এ কারণেই তাঁর ভাষণ এত দ্রুত মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাত; তিনি মানুষের কাছে এমন কোনো ভাষায় কথা বলেননি যা তাদের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন।
বিশ্বমঞ্চে স্বাধীন বাংলাদেশের কণ্ঠ
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন করেননি, আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা করেছেন। শীতল যুদ্ধের জটিল বাস্তবতায় সদ্য স্বাধীন একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ছিল কঠিন কাজ। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল সুর ছিল শান্তি, সার্বভৌমত্বের মর্যাদা এবং সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বাংলাদেশ দ্রুত বহু রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে জায়গা করে নেয় এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বিশ্বশান্তি ও নিপীড়িত মানুষের অধিকারের প্রশ্নেও বঙ্গবন্ধু বারবার কথা বলেছেন। তাঁর আন্তর্জাতিক বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তিনি কেবল একটি ভূখণ্ডের জন্ম হিসেবে দেখেননি; বরং শোষণ, বৈষম্য ও দমন থেকে মানুষের মুক্তির বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদকে একটি মানবিক মাত্রা দেয়। তিনি বাঙালির নেতা ছিলেন, কিন্তু তাঁর স্বাধীনতার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মর্যাদা। আজও তাই বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন রাষ্ট্রনায়ককে স্মরণ করা নয়; বরং স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়ের যে স্বপ্ন তিনি ধারণ করেছিলেন, সেই মূল্যবোধগুলোর দিকে ফিরে তাকানো।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগারে দীর্ঘ বন্দিদশা শেষে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবিঃ আর্কাইভ
তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে নন, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর স্থান অনস্বীকার্য
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা-পরবর্তী শাসন নিয়ে ইতিহাসে আলোচনা ও সমালোচনা আছে এবং থাকবে। একটি ভয়াবহ যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর সরকারের সাফল্য, সীমাবদ্ধতা, সিদ্ধান্ত ও সংকট—সবই গবেষণার বিষয়। ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করার অর্থ সমালোচনাকে বন্ধ করা নয়। কিন্তু সমালোচনা আর একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, ছয় দফা, সত্তরের গণরায়, ৭ মার্চের নেতৃত্ব এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান প্রামাণ্য ইতিহাসের অংশ। এ কারণেই বঙ্গবন্ধুকে কেবল কোনো দলীয় প্রতীক হিসেবে দেখলে তাঁকে ছোট করে দেখা হয়। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন—এটি সত্য; কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সেই রাজনৈতিক ধারার নেতা, যার নেতৃত্বে একটি জাতি নির্বাচনী ম্যান্ডেট থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে পৌঁছেছে। তাঁর ঐতিহাসিক মূল্যায়ন তাই দলীয় আনুগত্যের চেয়ে বড়; এটি বাংলাদেশের জন্মের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তারপর এলো ১৫ আগস্ট
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর বেদনাবিধুর অধ্যায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তাঁর সঙ্গে নিহত হন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালসহ পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। এই হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; একটি পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা ইতিহাসে এটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশু শেখ রাসেলের হত্যার ঘটনা ১৫ আগস্টের নৃশংসতার এক অমোচনীয় প্রতীক। রাজনৈতিক বিরোধের ভাষা যত কঠিনই হোক, একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার কোনো নৈতিক ব্যাখ্যা হতে পারে না।
আরও বেদনাদায়ক ছিল হত্যাকাণ্ডের পর বিচারহীনতার দীর্ঘ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালে জারি করা Indemnity Ordinance হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়। দুই দশকেরও বেশি সময় পর দায়মুক্তির সেই ব্যবস্থা বাতিল হলে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। একটি জাতিকে তার প্রতিষ্ঠাতা নেতার হত্যার বিচার শুরু করতেই এত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে—এটিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত।
বঙ্গবন্ধুকে কোথায় খুঁজব?
বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে হলে শুধু প্রতিকৃতির দিকে তাকালে হবে না। তাঁকে খুঁজতে হবে ভাষার অধিকারের আন্দোলনে, ছয় দফার পাতায়, আগরতলা মামলার কাঠগড়ায়, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের জনসমুদ্রে, সত্তরের ব্যালট বাক্সে, ৭ মার্চের বজ্রকণ্ঠে, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেরণায় এবং ১০ জানুয়ারির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আবেগে। তাঁকে খুঁজতে হবে সেই কৃষকের চোখে, যে বিশ্বাস করেছিল তারও রাজনৈতিক অধিকার আছে; সেই শ্রমিকের আকাঙ্ক্ষায়, যে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল; সেই তরুণের সাহসে, যে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিল। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। তিনি জনগণকে শুধু অনুসারী হিসেবে দেখেননি; জনগণের আশা, ক্ষোভ, বেদনা ও সাহসকে নিজের রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন। তাই তিনি যখন মঞ্চে দাঁড়াতেন, একা দাঁড়াতেন না—তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকত একটি জাতির আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাসে অনেক ক্ষমতাবান শাসক এসেছেন; কিন্তু মানুষের ভালোবাসা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠার ঘটনা ক্ষমতার পদবিতে পাওয়া যায় না।
নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু
আজকের নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে দেখবে দলীয় স্লোগানের বাইরে গিয়ে তথ্য, দলিল ও ইতিহাসের আলোকে—এটাই কাম্য। তারা প্রশ্ন করবে, গবেষণা করবে, তাঁর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা দুটোই জানবে। কিন্তু সেই অনুসন্ধানে ১৯৭০-এর গণরায়, ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৭১-এর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনে তাঁর ভূমিকাকে যথাযথ জায়গায় রাখতে হবে। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা মানে প্রশ্নহীন আনুগত্য নয়; বরং সত্যকে বিকৃত না করে তার পূর্ণাঙ্গ পাঠ। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খণ্ডিত তথ্য খুব দ্রুত ‘ইতিহাস’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দলিলনির্ভর ইতিহাসচর্চা আরও জরুরি। UNESCO-র স্বীকৃত ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল, মুজিবনগর সরকারের দলিল, ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক নথিপত্র—এসবই নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুকে বোঝার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি দেয়। ব্যক্তিপূজার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসপাঠ। সত্য নিজেই তাঁর স্থান নির্ধারণ করে।
শোকের সঙ্গে হোক ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা
১৫ আগস্ট আমাদের শুধু কাঁদায় না; আমাদের ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীলও করে। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে শেখায়—সহিংসতায় কি কখনো রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়? একটি দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে কি ইতিহাসের গতিপথ মুছে ফেলা যায়? উত্তর হলো—না। মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি ও দলিলভিত্তিক ইতিহাসকে বুলেট দিয়ে শেষ করা যায় না। বঙ্গবন্ধু নিজের স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে জীবিত ছিলেন মাত্র প্রায় সাড়ে তিন বছর। অথচ সেই বাংলাদেশের জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন জীবনের কয়েক দশক। কারাগার, মামলা, নির্যাতন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা—সবকিছুর মধ্যেও বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি অটল ছিলেন। ক্ষমতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁর সেই দীর্ঘ সংগ্রামের উত্তরাধিকার। তাই ১৫ আগস্টের শোক কেবল মৃত্যুর শোক নয়; এটি অসমাপ্ত স্বপ্ন, অসমাপ্ত রাষ্ট্রগঠন এবং ইতিহাসের এক নির্মম বিচ্ছেদের শোক।
শেষ কথা: মৃত্যু তাঁকে ইতিহাস থেকে সরাতে পারেনি
ঘাতকের বুলেট ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর জীবন থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু ইতিহাস থামাতে পারেনি। বুলেট ৭ মার্চের ভাষণ মুছে দিতে পারেনি। বুলেট ১৯৭০-এর গণরায় বদলে দিতে পারেনি। বুলেট মুজিবনগর সরকারের দলিল থেকে তাঁর নাম সরাতে পারেনি। বুলেট মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি থেকে তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকা মুছে দিতে পারেনি। টুঙ্গিপাড়ার সেই ‘খোকা’ তাই মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় নাম। কিছু মানুষ ইতিহাস হয়ে আসেন না—তাঁদের জীবন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ইতিহাস নতুন দিকে মোড় নেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই বিরল মানুষদের একজন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে মূল্যায়ন করা যাবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হবে, গবেষণায় নতুন তথ্য আসবে; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রায় তাঁর কেন্দ্রীয় ভূমিকা অস্বীকার করলে ইতিহাসই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
শোকাবহ ১৫ আগস্টে তাই গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে; শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলকে; সুলতানা কামাল, রোজী জামাল এবং সেই রাতে নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য, স্বজন ও অন্য শহিদদের। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু ফুলে নয়—সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চায়, মানবিক মূল্যবোধে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে প্রকাশ পাক। বাংলাদেশ থাকবে, তার স্বাধীনতার ইতিহাস থাকবে; আর সেই ইতিহাসের পাতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থাকবেন তাঁর সংগ্রাম, তাঁর বজ্রকণ্ঠ, তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস নিয়ে। কারণ ইতিহাস কোনো দিনের ক্ষমতার ভাষ্য নয়—ইতিহাস সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকা সত্যের নাম।
আল্লাহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৫ আগস্টে নিহত তাঁর পরিবারের সকল সদস্য, স্বজন ও অন্য শহিদদের ক্ষমা করুন, তাঁদের বেহেশত নসিব করুন। আমিন।
লেখক- এসএমএফ নবাব সিরাজউদ্দৌলা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au