আইএমএফ এর শর্ত না মানার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আগের ঋণ কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে এবং সংস্থাটির শর্ত বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সরকারের এই ঘোষণার পরও আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচি এবং নতুন ঋণের আবেদন নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্টতা তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ সংকলনেও ৫ অক্টোবর অর্থমন্ত্রীর ‘আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল করে দিয়েছি’ বক্তব্যটি প্রকাশিত হয়েছে।
রোববার( ঢাকায় ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই আইএমএফের ওপর নির্ভরতা কমানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণের ওপর নির্ভর করা যাবে না।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, আইএমএফ যে অর্থ দেবে, তা দিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ জন্য বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি জানান, বন্ড বাজার, ঋণপত্রভিত্তিক অর্থায়ন এবং শেয়ারবাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হবে। নিউইয়র্কে ডলার বন্ড এবং হংকংয়ে বাংলাদেশভিত্তিক তহবিল চালুর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি সামুরাই বন্ড ও পান্ডা বন্ডের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অর্থায়ন কাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
তবে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার সঙ্গে সরকারের আগের অবস্থানের কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কারণ, অর্থবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ গত জুনেই আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আবেদন করেছে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনা ও প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও জানা গেছে।
এ ছাড়া আগের ঋণ কর্মসূচিও পুরোপুরি শেষ হয়নি। চলমান কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়েও আইএমএফের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে অর্থমন্ত্রী যে কর্মসূচি বাতিলের কথা বলেছেন, সেটি আগের কর্মসূচি, নাকি নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আইএমএফ এর শর্ত না মানার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী।ছবিঃ বিবিসি
সরকারের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তার জানা অনুযায়ী আইএমএফের কর্মসূচি এখনো চলমান রয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রী কোন প্রেক্ষাপটে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, সরকার আইএমএফের শর্ত নিয়ে আপত্তির কথা বললেও বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সংস্থাটির ঋণ পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সরকারের জন্য কঠিন হতে পারে।
তার মতে, আইএমএফের ঋণের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো অর্থনৈতিক সংস্কার। কিন্তু সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় প্রথম দুই বছরে বড় ধরনের সংস্কারে না যাওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবার কার্ড, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি এবং বড় আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মতো ব্যয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে, যেগুলো আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
কোন শর্তে আপত্তি
নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশকে কয়েকটি ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি দেখাতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভর্তুকি কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানো। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আইএমএফের পক্ষ থেকে চাপ থাকতে পারে।
ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান ও দ্রব্যমূল্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভর্তুকি ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে সরকার এই পদক্ষেপে ধীরে এগোতে চাইছে। যদিও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতে এরই মধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকার ধাপে ধাপে এগোতে চায়। তবে আইএমএফের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। চলতি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় আসা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ওই সফরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া আগের ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হবে। এই পর্যালোচনার ওপরই চলমান কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নির্ভর করতে পারে।
আগের ঋণ কর্মসূচিতে কত টাকা
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করেছিল আইএমএফ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর্মসূচিটির পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও তা এখনো ছাড় হয়নি।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সরকার আগের ঋণ কর্মসূচির শর্ত মেনে চলতে আগ্রহী না হলেও নতুন করে প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি চাওয়ার অবস্থানে রয়েছে। তার ধারণা, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে এবং আগের কর্মসূচির তুলনায় আলোচনাটি আরও জটিল হতে পারে।
ফলে অর্থমন্ত্রীর আইএমএফের কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণার পর এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশ কি সত্যিই আইএমএফের ঋণ থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে, নাকি আগের শর্তযুক্ত কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন শর্তে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাবে। চলতি মাসে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরেই এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সুত্রঃ বিবিসি