‘কালোজাদু’র অপবাদে তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর অভিযোগ
নাটোরের গুরুদাসপুরে ‘কুফরি কালাম’ বা কালোজাদু করার অপবাদ দিয়ে তিন নারীকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের গলায় জুতার মালা…
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে ঘেরাও করে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর কাছ থেকে একটি কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেয়। উপাচার্যের দাবি, কাগজটি তাঁকে পড়তে দেওয়া হয়নি এবং তিনি ধারণা করছেন, সেটি ছিল পদত্যাগপত্র। স্বাক্ষর না করলে তাঁকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি সই করেন বলে জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। পরে বিকেলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পেছনে নিজের গেস্ট হাউসের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন অধ্যাপক জাওয়াদুল হক।
উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘রাজশাহী আপামর ছাত্রজনতা’র ব্যানারে একদল ব্যক্তি ‘উপাচার্য ঘেরাও কর্মসূচি’ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তাঁরা স্লোগান দিতে দিতে ভবনের ভেতরে ঢুকে নিচতলায় বক্তব্য দেন। একপর্যায়ে তাঁরা উপাচার্যের কক্ষে প্রবেশ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের সভাপতি শরফুজ্জামান শামীমের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল সেখানে যায়। তাঁদের সঙ্গে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিটের সভাপতি আল মোস্তাক শাহীন, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল, জিয়া মঞ্চের সভাপতি বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক লাল্টুও ছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করলেও উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শরফুজ্জামান শামীম। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিনি বলেন, তিনি মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন। উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ সঠিক নয়। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে এর আগে কয়েকবার মানববন্ধন হয়েছে এবং উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তাঁকে জানানোই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে রাজপাড়া থানা বিএনপির নেতা-কর্মীসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষ ছিলেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, তিনি বিকেলে ঘটনাটি শুনেছেন। মব সৃষ্টি করে কেউ বিশৃঙ্খলা করে থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের কোনো নেতা-কর্মী এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
‘আপনি আওয়ামী লীগের দোসর, এই চেয়ারে থাকবেন না’
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক জাওয়াদুল হক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, লোকজন অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে তাঁর কক্ষে ঢুকে তাঁকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ বলে আখ্যা দেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, তিনি রাজশাহীর মানুষকে কাজ দেন না এবং ঢাকার লোকজনকে দিয়ে কাজ করান।
উপাচার্যের ভাষ্য, তাঁকে বলা হয়, ‘আপনি এই চেয়ারে থাকবেন না।’ এরপর তাঁকে চেয়ার থেকে উঠে ওই মুহূর্তে কার্যালয় থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়।
ঘটনার সময় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন উল্লেখ করে জাওয়াদুল হক বলেন, একপর্যায়ে একজন তাঁর সামনে একটি কাগজ এগিয়ে দেন। তিনি কাগজটি কী, তা জানতে চান এবং পড়ার সুযোগ চান। কিন্তু তাঁকে কাগজটি দেখতে দেওয়া হয়নি।
উপাচার্য বলেন, ‘আমি বললাম, কী কাগজ? কাগজটা দেখার দরকার আছে। তারা বলল, “আপনার দেখার দরকার নাই, আপনি সই করেন।”’
এ সময় তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীও (পিএস) সেখানে ছিলেন। তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় বলে অভিযোগ করেন উপাচার্য।
জাওয়াদুল হক বলেন, পরিস্থিতি দেখে তাঁর আশঙ্কা হয়, তিনি কাগজে স্বাক্ষর না করলে তাঁকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হতে পারে। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি কাগজটিতে স্বাক্ষর করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি সই না করলে আমিও ফিজিক্যালি অ্যাসল্টের সম্মুখীন হতে পারি। আর তাদের সামনে দেওয়া কাগজটা প্রিন্টেড একটা কাগজ ছিল। আমাকে পড়ারও সুযোগ দেয়নি। তবে আমার কাছে মনে হলো যে একটা পদত্যাগপত্রই ছিল। ওপরে পদত্যাগপত্র, এ রকম একটা শব্দ আমার কাছে মনে হয়েছে। আমাকে পুরোটা পড়তে দেয়নি।’
স্বাক্ষরের পর কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ
উপাচার্য জানান, কাগজে স্বাক্ষর করার পর ওই ব্যক্তিরা সেটি নিয়ে নেন এবং তাঁকে কার্যালয় থেকে বের করে দেন। তাঁকে সেখানে আর দাঁড়াতেও নিষেধ করা হয়।
জাওয়াদুল হক বলেন, ‘আমি সই করে দিলে তারা কাগজটা নিয়ে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। তারা বলে, “আপনি এখন চলে যাবেন, এখানে দাঁড়াবেন না।”’
ঘটনার সময় তাঁর মুঠোফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। পরে সেটি তাঁকে ফেরত দেওয়া হয়।
কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর অফিসের কম্পিউটারের সিপিইউ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই সংযোগ ও বিদ্যুতের সংযোগ নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন দপ্তরে তালা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান উপাচার্য।
পিএসকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ
ঘটনার সময় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন উপাচার্যের পিএস ও সেকশন অফিসার (অর্থ) নাজমুল হোসাইনও।
তিনি বলেন, ‘আমাকে তারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। আমার শার্টের বোতাম ছিঁড়ে দিয়েছে। আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিনি। আমাকে ও ভিসি স্যারকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে তারা।’
তবে ওই ব্যক্তিরা কারা ছিলেন, তাঁদের সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না বলে জানিয়েছেন উপাচার্য।
জাওয়াদুল হক বলেন, সেখানে কৃষক দলের কয়েকজন ছিলেন বলে তিনি দেখতে পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এর আগে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করা একটি গোষ্ঠী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
তবে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ঘটনাস্থলে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন ছবি প্রকাশিত হয়েছে এবং সেগুলো দেখে তাঁদের শনাক্ত করা সম্ভব।
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার
অধ্যাপক জাওয়াদুল হক বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিজের ইচ্ছামতো লোক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়ে ভাঙচুর, মালামাল নিয়ে যাওয়া এবং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হবে বলে জানান উপাচার্য।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
ঘটনার পর বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবকে জানিয়েছেন বলে জানান অধ্যাপক জাওয়াদুল হক।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে পরীক্ষা চলছে। দ্রুত এ বিষয়ে সমাধান না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চলমান প্রকল্পগুলোর কাজও স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
উপাচার্য বলেন, ‘পরীক্ষা চলছে। এসব বিষয়ে যদি দ্রুত একটা সমাধান তাঁরা না দেন, তাহলে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম, একাডেমিক বলেন, প্রশাসনিক বলেন, আমাদের যে প্রকল্পের কাজগুলো চলছে, সেগুলো কিন্তু স্থবির হয়ে পড়বে।’
বিএনপি নেতার বক্তব্য
ঘটনার বিষয়ে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, ‘মব সৃষ্টি করে যেই বিশৃঙ্খলা করুক, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের কোনো নেতা-কর্মী এ ঘটনায় জড়িত থাকলে সাংগঠনিকভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে কৃষক দলের নেতা শরফুজ্জামান শামীম উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ জানানো এবং পদত্যাগের দাবি জানানোই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল।
পুলিশের কাছে এখনো লিখিত অভিযোগ নেই
ঘটনার খবর পেয়ে রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত থানায় এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
ফলে উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনার বিষয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
অধ্যাপক জাওয়াদুল হক ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর বিরুদ্ধে এর আগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও মঙ্গলবারের ঘটনায় তাঁকে কার্যালয় থেকে বের করে দিয়ে জোর করে একটি কাগজে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au