‘কালোজাদু’র অপবাদে তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর অভিযোগ। ছবিঃ সংগৃহীত
নাটোরের গুরুদাসপুরে ‘কুফরি কালাম’ বা কালোজাদু করার অপবাদ দিয়ে তিন নারীকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানো এবং পরে একটি ঘরে আটকে রেখে ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সোমবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে গুরুদাসপুর পৌরসভার গাড়িষাপাড়া মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় যুবদল কর্মী জিয়াউর রহমান জিয়া ও তাঁর সহযোগীরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। জিয়াউর রহমান ও তাঁর ভাই ইয়ারুল ইসলাম একই এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান জিয়ার এক ভাতিজি অসুস্থ হওয়ার পর তিন নারীর বিরুদ্ধে ‘কুফরি কালাম’ বা কালোজাদু করার অভিযোগ তোলা হয়। এরপর তাঁদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের বাড়িতে নেওয়ার পর মারধর ও প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা হয়। একপর্যায়ে তাঁদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে মহল্লার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়। পরে একটি ঘরে আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
তিন নারী জানিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ‘কুফরি কালাম’ করার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপবাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, তাঁদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য ভিন্ন।
ইয়ারুল ইসলাম সোমবার সন্ধ্যায় ওই তিন নারীর বিরুদ্ধে গুরুদাসপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, ওই নারীরা একজন কবিরাজের মাধ্যমে তাঁর মেয়ের ওপর ‘কুফরি কালাম’ করেছেন। এরপর থেকেই তাঁর মেয়ে শারীরিক সমস্যায় ভুগছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে তিন নারীকে মারধর, লাঞ্ছিত করা, তাঁদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো কিংবা ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইয়ারুল ইসলাম বলেন, এসব কাজ মহল্লার লোকজন করেছে। এসব ঘটনায় তিনি নিজে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
ইয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, ফাঁকা স্ট্যাম্পের কাগজপত্র তিনি গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হান্নান বলেন, তিন নারীকে লাঞ্ছিত করার বিষয়ে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো ধরনের কুসংস্কার, অলৌকিক বিশ্বাস কিংবা কালোজাদুর অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপবাদ দেওয়া বা প্রকাশ্যে হেনস্তা করার সুযোগ নেই। তাঁরা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অভিযোগ প্রমাণের কোনো আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তিন নারীকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করা হয়ে থাকলে, তা মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।