বিশ্ব

গেরিলা কায়দায় যন্তর মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা, রাহুল-প্রিয়াঙ্কাকে তুলে নিল পুলিশ

  • 6:40 am - October 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬৬ বার
বুধবার দিল্লিতে আইন অমান্য করে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শীর্ষ নেতারা। তাদের আটক করে দিল্লি পুলিশ। ছবিঃ রয়টার্স

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর বাতিলের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন দ্বিতীয় দিনেও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বুধবার দিল্লিতে আইন অমান্য করে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শীর্ষ নেতারা। তাদের আটক করে দিল্লি পুলিশ।

আটক হওয়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেসহ জোটের বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারাও। পুলিশের বাধা এড়িয়ে গেরিলা কায়দায় যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করলেও শেষ পর্যন্ত অশোক রোড এলাকায় তাদের পথ আটকে দেওয়া হয়।

আটকের কিছুক্ষণ আগে রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, জ্ঞানেশ কুমার ‘অবৈধ’ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তাঁর পদত্যাগ করতেই হবে। তাঁর অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন যে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে হচ্ছে।

রাহুল বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদি ভারতের গণতন্ত্র ধ্বংস করছেন। তাঁর ভাষায়, জ্ঞানেশকে ‘শিখণ্ডী’ করে গণতন্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন এবং যন্তর মন্তরে যেতেই হবে।

এর আগের দিন মঙ্গলবারও নির্বাচন কমিশনের দিকে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের চোখ এড়িয়ে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আকাশবাণী ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন। সেখানে প্রায় নয় ঘণ্টা অবস্থান করার পর পুলিশ তাঁদের আটক করে। অবশ্য প্রায় দুই ঘণ্টা পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

মধ্যাহ্নভোজের আড়ালে নতুন পরিকল্পনা

বুধবারের কর্মসূচি ছিল আগের দিনের তুলনায় অনেক বেশি কৌশলগত। ইন্ডিয়া জোটের নেতারা প্রকাশ্যে যন্তর মন্তর অভিযানের ঘোষণা দেননি। বরং দুপুরে দিল্লির কনট প্লেসের কাছে জনপথের একটি রেস্তোরাঁয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বিরোধী নেতাদের মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান।

সেখান থেকে নির্বাচন সদন ও যন্তর মন্তরের দূরত্ব খুব বেশি নয়। পরিকল্পনা ছিল, মধ্যাহ্নভোজের পর হঠাৎ করেই নেতারা যন্তর মন্তরের দিকে রওনা হবেন। পুলিশ যাতে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ না পায়, সে জন্য কর্মসূচিটি গোপন রাখা হয়েছিল।

তবে বিরোধী নেতাদের জমায়েতের খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত জনপথ এলাকা ঘিরে ফেলে। নির্ধারিত সময়ে একে একে সেখানে জড়ো হতে থাকেন বিরোধী নেতারা।

খাড়গে, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেসের অন্য শীর্ষ নেতারাও। তাঁদের পাশে দেখা যায় তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়ান ও মহুয়া মৈত্র, সিপিএম, আরজেডি, এনসিপিসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাদের।

মধ্যাহ্নভোজের সেই আয়োজনেই যন্তর মন্তরে যাওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।

দুটি বাসে যন্তর মন্তরের দিকে যাত্রা

পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে দুটি বাস আনা হয়। মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে বিরোধী নেতারা বাস দুটিতে উঠে পড়েন। এরপর বাস দুটি জনপথ ধরে মেরিডিয়েন হোটেলের দিকে এগোতে শুরু করে।

পুলিশ বাস দুটিকে থামানোর জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করলেও প্রথম দিকে সফল হয়নি। বিরোধী নেতাদের বহনকারী বাস ধীরে ধীরে অশোক রোডের দিকে এগিয়ে যায়। পরিকল্পনা ছিল, ওই পথ ধরে যন্তর মন্তরের দিকে পৌঁছানো।

তবে কিছুটা এগোনোর পর পুলিশের বাধার মুখে বাস থেমে যায়। একপর্যায়ে বাসের চাকার হাওয়াও ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। ফলে বাসে করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এর মধ্যেই কয়েক শ কংগ্রেস কর্মী ঘটনাস্থলে জড়ো হন। তখন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতা বাস থেকে নেমে কর্মীদের ভিড়ে মিশে যান। এরপর তাঁরা হেঁটে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু কিছুদূর এগোনোর পরই পুলিশ তাঁদের আটকে দেয়।

আটক করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি

বিরোধী নেতাদের আটকের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একদিকে চলতে থাকে ‘ভোটচুরি’সহ বিভিন্ন স্লোগান, অন্যদিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দেশ ছিল, আটক করার সময় যাতে কোনো নেতা বা নেত্রী আহত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু নেতাদের কেউই সহজে পুলিশের হাতে যেতে চাইছিলেন না।

একপর্যায়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাস্তায় শুয়ে পড়েন। রাহুল গান্ধীও রাস্তায় বসে পড়েন। তাঁদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়।

শেষ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যরা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে পাঁজাকোলা করে তুলে বাসে নিয়ে যান। তখন সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছিল এবং পুরো এলাকা আন্দোলনকারী ও কংগ্রেস কর্মীদের ভিড়ে পরিণত হয়।

‘১০০ এফআইআর হলেও কিছু যায় আসে না’

আটক হওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাহুল গান্ধী। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে প্রায় চার ডজন এফআইআর হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

রাহুল বলেন, এতে তাঁর কিছু যায় আসে না। বরং ১০০টি এফআইআর হলেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে যাবেন না। তাঁর ভাষায়, প্রতিটি এফআইআর তাঁর জন্য একটি করে ‘মেডেল’।

তিনি বলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন থামবে না।

বিরোধী জোটের নেতারা জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতেও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তাঁদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি তৈরি করছে।

১০ অক্টোবর ফের যন্তর মন্তর অভিযানের ডাক

ইন্ডিয়া জোটের পাশাপাশি অন্যান্য বিরোধী সংগঠনও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

আগামী ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে অভিযানের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, ওই দিন পুলিশ আন্দোলনকারীদের যে জায়গায় আটক করবে, সেটিই কার্যত তাদের কাছে ‘যন্তর মন্তর’ হয়ে উঠবে।

বুধবার দিল্লি প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করলেও তাঁদের আন্দোলন থামবে না। নির্বাচন কমিশনকে ‘পরিচ্ছন্ন’ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ডের কারণেই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাচ্ছে।

সিজেপির সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিল সিপিএমের ছাত্রসংগঠন এসএফআই, সিপিআইয়ের এআইএসএফ, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের এআইএসএ এবং আম আদমি পার্টির ছাত্রসংগঠন এএসএপি।

আইসার এক নেত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তাঁর দাবি, একদিকে রয়েছেন ভারতের জনগণ, অন্যদিকে বিজেপি। তাই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

জনরোষের আশঙ্কায় একের পর এক সফর বাতিল জ্ঞানেশের

এদিকে দেশজুড়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো হওয়ার মধ্যেই তাঁর একের পর এক রাজ্য সফর বাতিল হচ্ছে।

বুধবার তাঁর দুদিনের ছত্তিশগড় সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কমিশনের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বিজেপিশাসিত ওই রাজ্যে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সফরটি স্থগিত করা হয়।

ছত্তিশগড়ের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনিবার্য কারণে জ্ঞানেশ কুমারের সফর স্থগিত রাখা হয়েছে।

বিরোধীদের আন্দোলন শুরুর পর এর আগেও জ্ঞানেশ কুমারের একাধিক সফর বাতিল হয়েছে। প্রথমে উত্তর প্রদেশের বেরিলি ও বারানসির সফর বাতিল করা হয়। এরপর লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখন্ড সফরও বাতিল করা হয়েছে।

কমিশন সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দেশজুড়ে তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া ক্ষোভের কারণে জনসমক্ষে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন জ্ঞানেশ কুমার। তাঁকে ঘিরে সম্ভাব্য বিক্ষোভ ও জনরোষের আশঙ্কা রয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আপাতত দিল্লির বাইরে তাঁর চলাচল সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে কমিশন সূত্র জানিয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নিরাপত্তা ও প্রকাশ্য কর্মসূচিও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সূত্রঃ এএনআই

এই শাখার আরও খবর

দিনাজপুরে ধানক্ষেতে হিন্দু কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ, পরিবারের অভিযোগ ‘হত্যা’

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নিখোঁজের সাত দিন পর ধানক্ষেত থেকে প্রশান্ত রায় (১৭) নামে এক হিন্দু কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, প্রশান্তকে হত্যা করে…

দেশজুড়ে অর্থনৈতিক ধস, দারিদ্র্যসীমার নিচে যাচ্ছে ছয় কোটি মানুষ

বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কায় দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানি…

১০ উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি করল বিমান

বোয়িংয়ের পর এবার ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। নতুন এই বহরে থাকবে চারটি ওয়াইড-বডি এ৩৫০-৯০০…

দিনে দুপুরে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ফিরে এসে চুপচাপ সাব-রেজিস্টার

খুলনা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সামনে থেকে সদর সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে কয়েকজন ব্যক্তি তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় ৪০…

দাতব্য অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক ফার্স্ট লেডি গ্রেপ্তার

শিশুদের একটি হাসপাতালের জন্য সংগ্রহ করা দাতব্য অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক ফার্স্ট লেডি শিরান্থী রাজাপাকসেকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা। বুধবার রাজধানী কলম্বো থেকে…

৯০ কোটি দেনা, বেড়াতেন পালিয়ে; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন অমিতাভ বচ্চন

বলিউডের ‘বিগ বি’ খ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের জীবনেও এসেছিল এমন এক সময়, যখন তারকা খ্যাতি থাকলেও হাতে ছিল না কাজ, ব্যাংকে ছিল না টাকা। একসময়…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au