বাংলাদেশ

চাকরিচ্যুত, হামলার শিকার, বেতনহীন: চাপের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষকরা

  • 5:00 pm - October 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১০৩ বার
মঙ্গলবার রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ। ছবি: সংগৃহীত

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কার্যালয়ে ঢুকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কলেজের অধ্যক্ষকে প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আবার পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষকদের ধাক্কাধাক্কি ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো ও হামলার ঘটনা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠার দুই বছরেরও বেশি সময় পরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের সুরক্ষা, পুনর্বহাল এবং বেতন-ভাতা চালুর জন্য সরকারের একাধিক নির্দেশনা থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।

‘বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর হিসাবে, ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

জোটটির দাবি, শারীরিক ও মানসিক আঘাতের পর অন্তত আটজন শিক্ষক মারা গেছেন, ৫০০-এর বেশি শিক্ষক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন এবং এক হাজারের বেশি শিক্ষক এখনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

তবে এসব পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ

সর্বশেষ ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। অভিযোগ উঠেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে থাকা অবস্থায় একদল ব্যক্তি উপাচার্যের কার্যালয়ে ঢুকে অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হককে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন।

এ সময় তাঁর ব্যক্তিগত সচিব ও সেকশন কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন বাধা দিতে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয় এবং পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরে নাজমুল হোসেন রাজপাড়া থানায় মামলা করেন। ওই ঘটনায় আবদুস সালাম (৫৬) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ প্রথমে জানায়, গ্রেপ্তার আবদুস সালামের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সালাম থানা বিএনপির সহসভাপতি এবং ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

মোহাম্মদপুর কলেজেও উত্তেজনা

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজেও শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের বিরোধের ঘটনা ঘটে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের একটি দল কলেজের অধ্যক্ষ অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মো. শহীদুল হাসানকে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেয় এবং শিক্ষকদের হয়রানি করে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর একাদশ শ্রেণির ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বহিরাগত প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তালা দিয়ে অধ্যক্ষের অপসারণ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করার সময় বাংলা বিভাগের প্রভাষক শাওন আহমেদ কবিরকে ধাক্কা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা। শিক্ষক প্রতিনিধি ড. মোহাম্মদ শামসুল আলমও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

পরে শিক্ষকরা লিখিত অভিযোগ দিয়ে ঘটনার তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। কলেজের গভর্নিং বডি অভিযোগগুলো তদন্তের আশ্বাস দেয়।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল পরে তাদের দুই সদস্যকে বহিষ্কার করে।

‘এখনো বেতন পাচ্ছেন না এক হাজারের বেশি শিক্ষক’

শিক্ষক প্রতিনিধিদের দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ ও কর্মস্থলে বাধার যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল, তারই অংশ।

বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোটের আহ্বায়ক আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, এক হাজারের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক এখনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। অনেক শিক্ষক এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারেননি।

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বারবার যোগাযোগ করা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনা সামনে আসার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সরকার একাধিক নির্দেশনা জারি করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে সময় জানায়, কোনো শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়।

এরপর বেতন-ভাতা প্রদান, চাকরিতে পুনর্বহাল এবং সরকারি নির্দেশনা না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আরও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

তবে শিক্ষক প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এসব নির্দেশনার বাস্তবায়ন এখনো অসম্পূর্ণ।

বাড়িতে গিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ

ধামরাইয়ের সুয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর তিনিও জোর করে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া শিক্ষকদের একজন।

তাঁর অভিযোগ, ১১ আগস্ট একদল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ দাবি করেন। পরদিন প্রায় ১৫ জন তাঁর মিরপুরের বাসায় গিয়ে তাঁকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন।

সাবেক ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ও বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোটের সভাপতি মো. বেদার উদ্দিন আহমেদ বলেন, তাঁদের সংগঠন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ ও স্মারকলিপি দিয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক এখনো তাঁদের কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও ২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনাবলির পর জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় ও সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমও রয়েছেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত

শিক্ষকদের ওপর হামলা ও জোর করে পদত্যাগ করানোর অভিযোগ এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পর্যালোচনার আওতায় আসছে।

শিক্ষার অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফারিদা শহীদ আগামী ২৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করবেন বলে শিক্ষক জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জোটের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত হামলার অভিযোগগুলো তিনি পর্যালোচনা করবেন। এ সফরে ইউনেসকোর ঢাকা কার্যালয় সহযোগিতা করবে বলেও জানানো হয়েছে।

শিক্ষক জোট জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকরা এ প্রক্রিয়ার জন্য অভিযোগ ও বিভিন্ন নথি জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে চাকরির বর্তমান অবস্থা, মামলা, ছবি, ভিডিও এবং অডিও রেকর্ডিং রয়েছে।

তবে মোট কতটি অভিযোগ জমা পড়েছে, সে সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

‘অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে নিয়ম মেনে’

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, শিক্ষকদের ওপর হামলা ও হয়রানির পাশাপাশি বেতন-ভাতা ও পেশাগত মর্যাদা নিয়ে বিরোধ শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থার বড় সংকটের প্রতিফলন।

তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে মানসম্মত শিক্ষক প্রয়োজন। এ জন্য শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের পাশাপাশি তাঁদের যথাযথ মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, শিক্ষকদেরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা এবং শিক্ষকতার গুরুত্ব সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। অনিয়ম বা অসদাচরণের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে এসব প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়া উচিত। শারীরিক হামলা, অপমান, ভয়ভীতি দেখানো কিংবা জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো কোনোভাবেই সেই প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।

এই শাখার আরও খবর

কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসী নেতার বিরুদ্ধে মামলা

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির প্রভাবশালী আদিবাসী নেতা মিক মান্ডিনের বিরুদ্ধে ৪০ বছরেরও বেশি আগে এক কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ৭৯ বছর বয়সী মান্ডিনকে বৃহস্পতিবার সকাল…

মেসিকে রোনালদোর শ্রদ্ধা, ‘আপনার কীর্তি চিরকাল ইতিহাস হয়ে থাকবে’

আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে লিওনেল মেসির জাতীয় দল থেকে বিদায়ের আবেগঘন মুহূর্তে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাশে সরিয়ে রেখে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।…

হুথিদের হামলায় সৌদির দুই বিমানবন্দরে নিহত ৩, আহত ৩৬

সৌদি আরবের দুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠী। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং…

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে ভারতের গোয়ার ডোনা পাওলায় নিজ বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে মারা যান…

রোহিঙ্গা সহায়তায় ব্র্যাকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ১৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে অস্ট্রেলিয়া। এ লক্ষ্যে ব্র্যাকের সঙ্গে ১৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের (প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা) নতুন একটি…

বিদেশি সহায়তা কমায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ২ হাজারের বেশি এনজিও

বিদেশি অনুদান কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দুই হাজারের বেশি ছোট ও মাঝারি আকারের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au