বাংলাদেশ

তুচ্ছ ঘটনায় ঢাবি অধ্যাপককে সব ক্লাস থেকে অব্যাহতি

  • 9:23 pm - October 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৯৮ বার
ঢাবি অধ্যাপক তাসমিন সিরাজ মাহবুব। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেকাব পরা এক ছাত্রীকে পোশাক নিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগের পর শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের (২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ) একটি ক্লাসে ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। পরে বিষয়টি বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে জানানো হলে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা ডাকা হয়। সভায় ওই শিক্ষকের চলমান কোর্সগুলো থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে সেগুলো বিভাগের অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে শিক্ষকের বক্তব্য না নিয়েই এবং অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে সব ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, শিক্ষকের বক্তব্য গ্রহণ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়াকে অনেকের কাছে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অভিযোগের ভিত্তিতেই সরিয়ে দেওয়া হলো শিক্ষককে

ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি রেজুলেশন নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ওই রেজুলেশনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বর্তমানে তার কোর্সগুলো থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে।

তবে বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিজেই জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তার বা একাডেমিক কমিটির নেই। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী উপাচার্য, একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এখানেই প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার যখন উচ্চতর কর্তৃপক্ষের, তখন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের আগেই একজন শিক্ষককে তার সব ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা ন্যায়সংগত, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকটির পক্ষের লোকজন।

শিক্ষার্থীর অভিযোগ কী

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মল্লিকার অভিযোগ, ওই দিন অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের ক্লাসে তিনি শিক্ষকের ডেস্কের বাম পাশে বসেছিলেন। কয়েকবার চোখাচোখির পর শিক্ষক তাকে সেখানে বসে থাকলে ‘আনকমফোর্টেবল’ ও ‘আনসেফ’ বোধ করছেন বলে জানান। পরে তাকে অন্য শিক্ষার্থীদের ভিড়ের মধ্যে গিয়ে বসতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মল্লিকার দাবি, এরপর তার পোশাক ও নেকাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শিক্ষক। নেকাব পরার বিষয়টি ইসলামের কোথায় রয়েছে এবং কোন ফিকহে এর অনুমোদন রয়েছে, সে বিষয়েও শিক্ষক মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একপর্যায়ে শিক্ষক তাকে জানান, তিনি হজ করে এসেছেন এবং সেখানে মুখ খোলা রাখা যায়। বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে তিনি ক্লাস থেকে বের হয়ে যান বলে জানান মল্লিকা।

তার অভিযোগ, এর আগের একটি ক্লাসেও তাকে নেকাব খুলে দেওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন ওই শিক্ষক।

‘জঙ্গি’ ও ‘বোমা হামলাকারী’ বলার অভিযোগ

ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমির অভিযোগ, ক্লাসে নেকাব ও পর্দার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তিনি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পক্ষে কথা বলেন।

সুমির দাবি, এ সময় শিক্ষক ক্ষুব্ধ হয়ে মাযহাব অনুসরণের বিষয়েও মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ এবং সে ‘বোমা মারতে পারে’ এমন মন্তব্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও দাবি করেন, ওই শিক্ষার্থীকে সমর্থন করায় তাকেও প্রশ্ন করা হয়। পোশাক ও পর্দা নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বের হয়ে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এ ছাড়া ওই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন সুমি। তার দাবি, শিক্ষক নিজেকে ‘রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং কেউ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর কোনটি কী প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল এবং অভিযোগের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা কী, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন কেন

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তদন্ত প্রক্রিয়ায় অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় শিক্ষককে সব চলমান কোর্স থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অথচ বিভাগীয় চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একাডেমিক কমিটির নেই।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নাকি কার্যত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করছে?

শিক্ষকটির পক্ষ থেকে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গাটিও এখানেই। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে একজন শিক্ষককে ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত রাখলে তার পেশাগত মর্যাদা ও ভাবমূর্তিতে প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগটি যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হয়, তাহলে ওই সময়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায় কে নেবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি

ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো শিক্ষার্থীকে ধর্মীয় পরিচয় বা পোশাকের কারণে অপমান করা, ‘জঙ্গি’ বা ‘বোমা হামলাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করার অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবশ্যই তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।

একইভাবে, অভিযোগ উঠেছে বলেই অভিযুক্ত শিক্ষককে আগেই দোষী ধরে নেওয়াও উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া হওয়া উচিত নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং উভয় পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে।

এ কারণে শিক্ষকটির বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, ক্লাসে উপস্থিত অন্য শিক্ষার্থীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে কি না, কোনো অডিও বা ভিডিও রেকর্ড রয়েছে কি না এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও সামনে আসা প্রয়োজন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি

ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

অর্থাৎ বর্তমানে অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

এখন প্রশাসনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা। অভিযোগ সত্য হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের প্রমাণ না মিললে শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকারও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ন্যায্য অধিকার এবং প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই শাখার আরও খবর

যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের

অস্ট্রেলিয়ার পার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সোমবার অনুষ্ঠিত এসব বৈঠক ‘ল্যান্ড ফোর্সেস ইন্টারন্যাশনাল…

হরমুজে নৌ চলাচলের নিরাপদ করিডর গঠনে ওমানের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য নিরাপদ নৌ চলাচলের করিডর গঠনে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। তেহরান বলছে, প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ…

তিন ঘণ্টা ব্যবধানে জাপানের পূর্বাঞ্চলে জোড়া ভূমিকম্প

জাপানের পূর্বাঞ্চলে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে চিবা ও ইবারাকি প্রিফেকচারের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে। তবে কোনো…

​হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি ও বাস্তবতা: খণ্ডিত নিন্দা নয়, প্রয়োজন গত দুই বছরের নির্যাতনের সামগ্রিক শ্বেতপত্র

​৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা যেন এক অন্তহীন নাটকের চিরচেনা দৃশ্যপট। ২৬…

নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার দাবি ট্রাম্পের, সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয়ও

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, বিশ্বে কয়েকটি সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রাখার কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য তিনি। তবে ২০২৬ সালের পুরস্কার শেষ পর্যন্ত…

সন্ন্যাসীর সাজা ঘোষণার পরও প্রশংসা, ক্ষোভে ফুঁসছেন ভুক্তভোগীরা

অস্ট্রেলিয়ায় শিশুদের যৌন নির্যাতনের দায়ে কারাদণ্ড পাওয়া সাবেক বৌদ্ধ প্রধান সন্ন্যাসী নাওতুনে বিজিথাকে কারাগারে নেওয়ার সময় তার সমর্থকদের উচ্ছ্বসিত আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ৭১…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au