মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।ছবিঃ সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের দুটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে বিজেপির বড় ব্যবধানে জয়ের পর ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের ফলকে তাচ্ছিল্য করে তিনি বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এমন ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা যেত। একই সঙ্গে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিজেপিকে কটাক্ষ করেছেন তিনি। অন্যদিকে, উপনির্বাচনের ফলাফলকে রাজ্য সরকারের প্রতি সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
শুক্রবার দিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসব মন্তব্য করেন। রেজিনগরের একটি বুথে মোট ভোটারের তুলনায় বেশি ভোট পড়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “৭৭২ জন ভোটার আর ভোট পড়েছে ৯০৯। তার মানে পুলিশকে দিয়ে ছাপ্পা করালে এরকমই হয়।”
উপনির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মমতা বলেন, “এটা কোনও ভোট হয়েছে যে, ফল নিয়ে বলব। এরা ঠিক মতো ছাপ্পাও মারতে পারে না!”
এ সময় উপনির্বাচনের ফলাফল নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর সংবাদ সম্মেলন সম্পর্কেও তাঁকে প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্ন শুনে বিরক্তি প্রকাশ করে মমতা বলেন, “আরে ছাড়ুন, আরে ছাড়ুন ছাড়ুন। মাথাটা আগে ঠিক করতে বলুন।”
দুই আসনেই বিজেপির বড় জয়
গত মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম এবং মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার ফল ঘোষণা করা হলে দুই আসনেই বড় ব্যবধানে জয় পায় বিজেপি।
নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথ এক লাখ ২২ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নিহত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা। তাঁর এই জয় নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর আগের জয়ের ব্যবধানকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রেজিনগর আসনে বিজেপির প্রার্থী শাখারভ সরকার ৭২ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পান। দুই আসনেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। ফলে এই ফলাফলকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগরে বিজেপির বড় জয় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ তৃণমূলের সমর্থনে যাওয়ার যে রাজনৈতিক ধারণা রয়েছে, এই ফলাফল সেই সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে শুধু উপনির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে রাজ্যের সব সংখ্যালঘু ভোটারের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
রেজিনগরের ভোট নিয়ে অভিষেকের অভিযোগ
শুক্রবার দুপুরে রেজিনগরের একটি বুথের ভোটের হিসাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করে তিনি দাবি করেন, ওই বুথে মোট ভোটারের সংখ্যার তুলনায় বিজেপি বেশি ভোট পেয়েছে।
অভিষেকের প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, বুথটিতে মোট ভোটার ছিলেন ৭৭২ জন। অথচ বিজেপি পেয়েছে ৯০৯ ভোট বলে দাবি করা হয়। এই হিসাব সামনে এনে তিনি ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
পরে দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় একই অভিযোগের প্রসঙ্গ টানেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, ভোটারসংখ্যার তুলনায় বেশি ভোট দেখানো হলে তা নির্বাচনী অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। এ জন্য তিনি পুলিশকে ব্যবহার করে ছাপ্পা ভোট দেওয়ার অভিযোগও তোলেন।
তবে প্রকাশিত স্ক্রিনশটের তথ্য, সংশ্লিষ্ট বুথের সরকারি ভোটের হিসাব এবং ফলাফলের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই না করে অভিযোগটিকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া গেলে অভিযোগটির সত্যতা আরও স্পষ্ট হবে।
শুভেন্দুর দাবি, সংখ্যালঘুরাও বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন
উপনির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পর শুক্রবার বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি দাবি করেন, রাজ্য সরকারের কাজের প্রতি আস্থা রেখেই সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি অংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, “ফ্রেন্ডশিপ বন গয়া!”
শুভেন্দুর এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, বিজেপি শুধু নিজেদের প্রচলিত সমর্থকগোষ্ঠীর ভোটের ওপর নির্ভর করেই জয় পায়নি, বরং সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যেও সমর্থন তৈরি করতে পেরেছে বলে তিনি দাবি করছেন। বিশেষ করে রেজিনগরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বড় ব্যবধানের জয়কে তিনি রাজনৈতিক সমর্থনের বিস্তারের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।
তবে নির্বাচনের ফলাফল থেকে কোন সম্প্রদায়ের কতজন ভোটার কোন দলকে ভোট দিয়েছেন, তা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না। এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ভোটারদের আচরণ নিয়ে নির্ভরযোগ্য জরিপ বা অন্য প্রমাণ প্রয়োজন। ফলে শুভেন্দুর বক্তব্যকে আপাতত বিজেপির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখা উচিত।
দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে মমতা
উপনির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই শুক্রবার দিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে যোগ দিতে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের বাংলো থেকে তাঁকে বৈঠকের উদ্দেশে রওনা হতে দেখা যায়। এ সময় গাড়ি চালাচ্ছিলেন ডেরেক ও’ব্রায়েন নিজেই। পাশের আসনে বসেছিলেন মমতা।
দিল্লিতে বিরোধী জোটের বৈঠকে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের উপনির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তাঁর মন্তব্য রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে বিজেপি দুই আসনে বড় ব্যবধানে জয়কে নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিজেপি এই জয়কে নিজেদের জনসমর্থন বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। শুভেন্দু অধিকারী বিশেষভাবে সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের হিসাব নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।
এখন এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রেজিনগরের বুথসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান কী এবং অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রামাণ্য তথ্য রয়েছে কি না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব পাওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, দুই আসনে বিজেপির বড় জয় শুধু তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করেনি, সংখ্যালঘু ভোটের প্রচলিত সমীকরণ, বিজেপির জনভিত্তি এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন বিতর্ক সামনে এনেছে। তবে ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের বাইরে প্রকৃত ভোটের হিসাব ও ভোটারদের আচরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যই শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সূত্রঃ দ্য ওয়াল