নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিসির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। ছবিঃ রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) আইসিসির সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। এতে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুধু আইসিসির প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মতো ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার পরিবর্তে আদালতকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এর ফলে আদালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে রয়টার্সের পর্যালোচনা করা এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আমেরিকানদের বিচার করার অনুমতি দেবেন না।”
রুবিওর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ‘বেপরোয়া আদালতের’ সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করবে। এর মাধ্যমে আদালটির সম্পদের প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে বিরোধ
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান। বিশেষ করে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে। এসব কর্মকর্তার মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও রয়েছেন।
এ ছাড়া আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির অতীতের একটি তদন্ত নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আদালটির বিরোধ তৈরি হয়েছিল। তবে ওই তদন্তটি পরে বন্ধ করে দেয় আদালত।
২০০২ সালে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করার উদ্দেশ্যে আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে আদালটির সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১২৫। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোর সব সদস্যরাষ্ট্র এর সদস্য। আদালটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুক্রবার তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপের বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়ছে, তখন এ পুরস্কারের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় তারা।
কমিটি বলেছে, “যে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থায় যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পান, তা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের জন্য অপরিহার্য।”
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি
মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনের জন্য আইসিসি ও এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে সময় দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্বেগের সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় লাইসেন্স দেবে। এর মাধ্যমে কিছু বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাধারণত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির কোম্পানিগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করতে পারে না। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব বন্ধ করতে পারে, বিমা কোম্পানিগুলো সেবা প্রত্যাহার করতে পারে এবং সফটওয়্যার সরবরাহকারীরা সহযোগিতা বন্ধ করে দিতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।
আইসিসির কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরেই আদালতটির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর অংশ হিসেবে তাঁরা অফিসের কম্পিউটারগুলোতে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে উন্মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবা ও স্বাস্থ্যবিমার বিকল্প ব্যবস্থাও গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ যুক্তরাষ্ট্রের
আইসিসির রেজিস্ট্রার ওসওয়ালদো জাভালা গিলের এ সপ্তাহের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি একটি ‘ব্লকিং মেকানিজম’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানান। এর উদ্দেশ্য হবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রভাব থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া।
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল, আইসিসি এবং আদালটির প্রতিষ্ঠাকালীন রোম সংবিধির সদস্যরাষ্ট্রগুলো মার্কিন উদ্বেগের সমাধানে পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু তা না হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “হয় আইসিসি তাদের হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসির অবসান ঘটাব।”
রুবিও আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যদের ওপর প্রতিরক্ষার জন্য নির্ভরশীল মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে ওয়াশিংটন আশা করে, তারা আদালটির কার্যক্রম সীমিত করতে সহায়তা করবে।
তবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের পদক্ষেপ আরও পরিবর্তন বা জোরদার করবে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রম, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে আদালটির ওপর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত চাপ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
সূত্রঃ রয়টার্স