চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিদ্যালয়সংলগ্ন জমি থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া এক তরুণী গৃহবধূর পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। নিহতের নাম চন্দনা রানী শীল (২২)। পরিবারের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের পর স্বামী শিমুল শীল তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের টেরিয়াইল উচ্চবিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের একটি জমির আইল থেকে চন্দনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের বড় কুমিরা এলাকার মানিক ডাক্তারবাড়ির বাসিন্দা শিমুল শীলের স্ত্রী।
পুলিশ জানায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় ওই নারীর দুই হাত সামনের দিকে কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। তাঁর গলায় প্যাঁচানো ছিল একটি ওড়না। প্রাথমিকভাবে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মরদেহ উদ্ধারের পর প্রথমে ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার পর নিহতের বাবা তেজেন্দ্র দাস সীতাকুণ্ড থানায় গিয়ে মরদেহটি তাঁর মেয়ে চন্দনা রানী শীলের বলে শনাক্ত করেন।
নিহতের বাবা তেজেন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে চন্দনাকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন করতেন তাঁর স্বামী শিমুল শীল। সংসারে শান্তি বজায় রাখতে চন্দনা দীর্ঘদিন ধরে এসব নির্যাতন সহ্য করে আসছিলেন।
তিনি জানান, গত বুধবারও যৌতুকের টাকার জন্য চন্দনাকে চাপ দেন শিমুল। একপর্যায়ে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়িতে যান চন্দনা। সেখানে স্বামীর টাকার দাবির কথা জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মেয়ের কষ্ট দেখে কিছুদিনের মধ্যে টাকা জোগাড় করে দেওয়ার আশ্বাস দেন তেজেন্দ্র দাস। এরপর চন্দনা স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যান।
তেজেন্দ্র দাস আরও বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার পর থেকে মেয়ের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও মেয়েকে না পেয়ে তিনি জামাই শিমুলকে ফোন করেন। কিন্তু শিমুল তাঁর স্ত্রীর বিষয়ে কিছু জানেন না বলে ফোন কেটে দেন।
পরদিন শুক্রবার বিকেলে তেজেন্দ্র দাসের এক ভাগিনা মোবাইল ফোনে উদ্ধার হওয়া নারীর মরদেহের ছবি দেখতে পান। ছবিটি চন্দনার বলে সন্দেহ হলে তিনি পরিবারের সদস্যদের জানান। পরে পরিবারের লোকজন সীতাকুণ্ড থানায় গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।
এদিকে মেয়েকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন চন্দনার মা আলো রানী দাস। তিনি অভিযোগ করেন, যৌতুকের দাবিতে শিমুল প্রায় প্রতি রাতেই তাঁর মেয়েকে নির্যাতন করতেন। স্বামীর আর্থিক দাবি পূরণের জন্য চন্দনা স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এরপরও তাঁর ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আলো রানী দাস মেয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চন্দনার স্বামী শিমুল শীলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম জানান, মরদেহ উদ্ধারের সময় ওই নারীর হাতে শাঁখা দেখে প্রাথমিকভাবে তাঁকে সনাতন ধর্মাবলম্বী বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে তাঁর বাবা-মা থানায় এসে পরিচয় নিশ্চিত করেন।
ওসি আরও বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।