বিশ্ব

আইসিসির বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা: কী বলছে ইইউ জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী দেশগুলো

  • 1:28 pm - October 10, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫৭ বার
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ভবন।ছবিঃ সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত ঘিরে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাপানসহ বিশ্বের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এর ফলে আদালতটির আর্থিক লেনদেন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশটির নাগরিকদের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারিক কার্যক্রম থেকে সুরক্ষিত রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করেছে বিশ্বের আটটি প্রভাবশালী দেশ। যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও নেদারল্যান্ডস এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা আইসিসির প্রতি তাদের অব্যাহত ও অটল সমর্থন বজায় রাখবে।

দেশগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে আদালতটির ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে আদালতটির সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১২৫টি।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করে আইসিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। আদালতটির মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিবৃতিতে আইসিসি বলেছে, ইতিহাস একদিন এই মুহূর্তের বিচার করবে। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে আদালত সরে আসবে না বলেও জানানো হয়েছে।

আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ হবে না। নানা ধরনের চাপ ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।

এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মার্কিন সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বসম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর এটি বড় ধরনের আঘাত।

গুতেরেসের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বৈশ্বিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো আইসিসি। ফলে আদালতটির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে দুর্ভাগ্যজনক বলে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেও ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আইসিসির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থানের প্রশংসা করেছেন তিনি।

এর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আইসিসি। ওই পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আদালতটির বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

এদিকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সাবেক আইসিসি বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতটির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আইসিসির সঙ্গে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতটিকে ব্যাংকিং, সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন পণ্য ও প্রযুক্তিগত সেবা দিতে পারবে না।

রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষাই এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইসিসির বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।

আইসিসিকে একটি বিপথগামী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ করেছে, আদালতটি এমন ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যাঁদের কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

মার্কো রুবিও আরও বলেন, আইসিসি যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকিমূলক কার্যক্রম বন্ধ না করে, তাহলে আদালতটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি আইসিসিকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন।

মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আইসিসির বিরোধের পেছনে রয়েছে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আদালতটির অতীত তদন্ত। যদিও সেই তদন্ত ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবুও বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ রয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও দুই পক্ষের সম্পর্কের অবনতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিলের কোনো সরাসরি দাবি উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির ১৭ জন বিচারক ও কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু এবারের পদক্ষেপে প্রথমবারের মতো আদালতটিকেই একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

ফলে আইসিসির আর্থিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অবশ্য নতুন নিষেধাজ্ঞার কিছু বিধান কার্যকর হওয়ার আগে ছয় মাসের ছাড়ের সময় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সময়ের মধ্যে আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলো আদালতটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ প্রদান অব্যাহত রাখতে পারবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আইসিসি ও এর সদস্যদেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান নিয়ে আলোচনার সুযোগ দিতেই এই সময় দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন আশা করছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।

রুবিওর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছে। সেই কারণেই আদালতটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করা হয়েছিল।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরোধিতার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আদালতটির অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সেবা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা অব্যাহত থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর একটি বড় অংশ আইসিসির স্বাধীনতা ও কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অপরাধবিচার ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

চাঁদা না পেয়ে লুটপাট, দখল-চাঁদাবাজি থামাতে ব্যর্থ কেন সরকার?

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, হামলা ও ভাঙচুরের একের পর এক ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আবাসিক ভবন নির্মাণেও চাঁদা…

ট্রাম্পের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কে এই ক্যাটি জাকারিয়া?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সমর্থক ক্যাটি জাকারিয়া। ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তাঁর…

সীতাকুণ্ডে হিন্দু গৃহবধূর হাত বাঁধা মরদেহ উদ্ধার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিদ্যালয়সংলগ্ন জমি থেকে হাত বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া এক তরুণী গৃহবধূর পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। নিহতের নাম চন্দনা রানী শীল (২২)। পরিবারের অভিযোগ,…

পানামায় ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি

মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় শক্তিশালী ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। শুক্রবার, ৯ অক্টোবরের এই ভূমিকম্পে রাজধানী পানামা সিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত…

হাসিনার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা হয়, দেশে ফিরতে চান তিনি: জি এম কাদের

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর মাঝেমধ্যে কথা হয়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরতে চান, তবে সরকার তাঁকে…

সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে কার্যত লকডাউন দিল্লি, বন্ধ ৪৫ মেট্রো স্টেশন

ভারতের দিল্লিতে ককক্রোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ও মিছিলকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে অনুষ্ঠেয় এ কর্মসূচি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au