সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান(বামে), সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) নুরউদ্দিন খান(ডানে)। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশের তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরির খবরের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) নুরউদ্দিন খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকার মহাখালীতে নুরউদ্দিন খানের বাসভবনে যান রাষ্ট্রপতি। সরকারের সঙ্গে সেনাপ্রধানের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে তাঁর মধ্যস্থতা চাওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে বঙ্গভবনের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনাপ্রধানের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে আলোচনা চলার সময় এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। তবে সরকারের সঙ্গে সেনাপ্রধানের সম্পর্কের অবনতি কিংবা রাষ্ট্রপতির মধ্যস্থতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সেনাপ্রধানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নের উদ্যোগের খবর
প্রতিবেদনে বঙ্গভবনের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত ৭ অক্টোবর সরকার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে প্রেষণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই সময় তিনি সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন এবং সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল।
তবে সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোর ওপর সেনাপ্রধানের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরে ওই উদ্যোগ থেকে সরে আসে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
এর পরদিনই রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাবেক সেনাপ্রধান নুরউদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবেও সরকারের সঙ্গে সেনাপ্রধানের দূরত্ব কমাতে নুরউদ্দিন খানের সহায়তা চাইতে পারেন।
তবে সেনাপ্রধানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে পারেন সেনাপ্রধান
সেনা সদর দপ্তরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশে ফেরার কথা থাকলেও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিশেষ প্রশাসনিক বৈঠকে অংশ নিতে পারেন।
বৈঠকটি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের উপকমান্ডার মেজর জেনারেল জোয়েল ভাওয়েলের সঙ্গে সেনাপ্রধানের আলোচনার ধারাবাহিকতা হিসেবে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোরও অংশ নিতে পারেন। গোর একই সঙ্গে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে প্রস্তাবিত বৈঠকের সময়সূচি, অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি কিংবা আলোচ্যসূচি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
কে এই সাবেক সেনাপ্রধান নুরউদ্দিন খান?
জেনারেল (অব.) নুরউদ্দিন খান বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৯০-এর দশকে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদকে নুরউদ্দিন খান সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এরশাদকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অবসরের পর নুরউদ্দিন খান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি একাধিকবার নরসিংদী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
জ্বালানিমন্ত্রী থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস কোম্পানি অক্সিডেন্টাল ও ইউনোকল বাংলাদেশের সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) স্বাক্ষর করে। পরে ইউনোকলের বাংলাদেশে পরিচালিত কার্যক্রম শেভরনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে শেভরন বাংলাদেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নুরউদ্দিন খানের সঙ্গে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবেও আলোচনায় এসেছিল তাঁর নাম
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রার্থী হিসেবে নুরউদ্দিন খানের নাম একাধিকবার আলোচনায় আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে বঙ্গভবনের সূত্রটি ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নুরউদ্দিন খানের সাক্ষাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য, সরকারের সঙ্গে সেনাপ্রধানের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা এবং এ বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনে নেই। ফলে সাক্ষাৎটিকে সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা হিসেবে নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করার সুযোগ নেই।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ