বাংলাদেশ

সম্পাদকীয়

দারিদ্র্যের পথে ৬ কোটি মানুষ, কোন পথে দেশ?

সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, ওটিএন বাংলা, মেলবোর্ন

  • 11:03 pm - October 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭২ বার
ঢাকায় টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক অসহায় মানুষ। ছবি : সংগৃহীত

দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে গরিব মানুষের সংখ্যাও। দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখন সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকটে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশ এখন কোন দিকে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কায় বাংলাদেশে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। এ সতর্কবার্তা সত্যিই আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে দারিদ্র্য কমানোর দীর্ঘদিনের অগ্রগতি এখন বিপরীতমুখী। ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠতে পারে।

আমার মনে হয়, এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ মূল্যস্ফীতি। আয় কিছুটা বাড়লেও নিত্যপণ্যের দাম তার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সংসারের ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙার পাশাপাশি ঋণ করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর সামাজিক প্রভাবও গুরুতর হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মঘণ্টা কমছে, কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই কর্মসংস্থানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এক্ষেত্রে নারীরা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

আমার ধারণামতে, দারিদ্র্য বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা। প্রত্যক্ষ কর ও সরকারি সহায়তা দরিদ্র মানুষের কিছুটা উপকার করলেও পরোক্ষ করের চাপ সেই সুফল কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো অনেক সময় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তার তুলনায় বেশি অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করছে। এমন কাঠামো অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট। ২০২৬ সালে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৯০টি কর্মসূচি চললেও সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ৬২ শতাংশই এসব সুবিধার বাইরে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ১৮ শতাংশ সুবিধা পাচ্ছে। অর্থাৎ যাদের সুরক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছেই রাষ্ট্রীয় সহায়তা যথেষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসে বিপুল ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরে এ খাতে সরকারের ভর্তুকি ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছালেও সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ভর্তুকির মাত্র ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ সুবিধা পেয়েছে। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবার পেয়েছে ৩৩ শতাংশ। তাই ভর্তুকির উদ্দেশ্য ও বণ্টন নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছি।

আইন-শৃঙ্খলার অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। এতে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয় এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়। বর্তমানে সেটিই হচ্ছে। এ কারণে অর্থনীতির এই সংকটের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও সংকটকে আরও জটিল করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক দাম বেড়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির বিল ১০৭ শতাংশ এবং সারের আমদানি ৪২ শতাংশ বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও খাদ্যপণ্যের দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমার মতে, এই পরিস্থিতিতে কেবল প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে অর্থনীতির সফলতা বিচার করলে চলবে না। মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও ক্রয়ক্ষমতা—এসব সূচককে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছি।

সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়, ওটিএন বাংলা, মেলবোর্ন

এই শাখার আরও খবর

এনসিটি ইজারা বাতিলের দাবি, প্রয়োজনে হরতালে যাওয়ার ঘোষণা জোটের

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। একই সঙ্গে সোমবার (১২ অক্টোবর) বন্দর…

রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের হামলা, আগের হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১৩

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববারের এ হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এর…

অস্ট্রেলিয়ায় কোথায় কবে দুর্গাপূজা

অস্ট্রেলিয়ায় শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে প্রস্তুত বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ২০২৬ সালের দুর্গোৎসব উপলক্ষে দেশটির আটটি রাজ্য ও অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মিলনমেলার আয়োজন…

হঠাৎ সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা, পর্যটকদের গন্তব্যে ফেরার নির্দেশ

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক পর্যটনকেন্দ্র অনিবার্য কারণবশত সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টার মধ্যে সাজেক…

না ফেরার দেশে ষাটের দশকের নায়িকা নাসিমা খান

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা নাসিমা খান আর নেই। রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৮টার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস…

নেত্রীকে ফেরানোর দৃপ্ত শপথ নেওয়া গোপালগঞ্জ আ. লীগ সভাপতির চিরবিদায়

গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুব আলী খান (৭০) মারা গেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে দলের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au