রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ সংকুচিত হওয়া, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননাকর আচরণ এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাঙালি সংস্কৃতিকর্মী ও সংগীতপ্রেমীদের সংগঠন প্রতীতি অস্ট্রেলিয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি ও সৃষ্টিকর্মে কালি লেপন এবং ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ভাঙচুরের মতো ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সংগঠনটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা, শিল্প-সাহিত্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবাদী বিবৃতিতে প্রতীতি অস্ট্রেলিয়া এসব দাবি জানায়। বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, বাংলা সংস্কৃতি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের একক সম্পত্তি নয়। মানুষের সম্মিলিত জীবনবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং বহুত্বের সৌন্দর্যকে ধারণ করেই বাংলা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, গান, কবিতা, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সাংস্কৃতিক পরিসর যখন ভয়, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার শিকার হয়, তখন তা শুধু শিল্পের স্বাধীনতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সমাজের মানবিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি কিংবা তাঁর সৃষ্টিকর্মের ওপর কালি লেপনের ঘটনায় গভীর ব্যথা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি বলেছে, রবীন্দ্রনাথ কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নন। তিনি সমগ্র বাঙালির সাহিত্য, সংগীত ও মননজগতের অমূল্য সম্পদ। তাঁর সৃষ্টিকর্মের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে অবজ্ঞা করার শামিল।
প্রতীতি অস্ট্রেলিয়ার বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লেপন কিংবা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এসব কর্মকাণ্ড জাতীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানুষের সম্মিলিত স্মৃতির প্রতি অবমাননার বহিঃপ্রকাশ। বহু প্রজন্মের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধ্বংস করে কোনো জাতির অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতি তীব্র ধিক্কার ও নিন্দা জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, মতাদর্শের ভিন্নতা কিংবা বিশ্বাসের পার্থক্যকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো ঐতিহাসিক ভাস্কর্য, শিল্পকর্ম বা সাংস্কৃতিক স্মারক ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই। একইভাবে মতপার্থক্য কখনো শিল্প-সাহিত্যের ওপর আক্রমণ, সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা সৃষ্টি কিংবা অন্যের বিশ্বাস ও পরিচয়ের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর বৈধতা দিতে পারে না।
সংগঠনটির মতে, ইতিহাসের কোনো বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে তার সমাধান হতে পারে যুক্তি, আলোচনা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার মাধ্যমে। ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে নয়। একটি জাতির পরিচয় তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঐতিহাসিক স্মারক ধ্বংস করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের অতীতকে জানার ও বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, একটি সুস্থ সমাজে সংস্কৃতির জবাব হওয়া উচিত আরও সংস্কৃতি, বিদ্বেষের জবাব হওয়া উচিত মানবিকতা এবং অসহিষ্ণুতার জবাব হওয়া উচিত যুক্তি, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
বাংলাদেশে স্বাধীন ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে প্রতীতি অস্ট্রেলিয়া বলেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক স্থাপনা এবং শিল্পকর্মের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতা এবং শিল্প-সাহিত্যের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর ও ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ ছাড়া শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে ইচ্ছুক মানুষের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করলেও বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ভৌগোলিক দূরত্ব শিকড়ের প্রতি দায়িত্ববোধ কমিয়ে দেয় না। বাংলা ভাষা, গান ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশের বিষয়ে তারা গভীরভাবে সংবেদনশীল।
প্রতীতি অস্ট্রেলিয়া স্পষ্ট করে বলেছে, তাদের এই প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তি, ধর্মীয় সম্প্রদায় কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রকাশের উদ্দেশ্যে নয়। বরং এটি শিল্পের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থান এবং মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকারের পক্ষে একটি অবস্থান।
সংগঠনটি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানিয়েছে, যেখানে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা করতে কাউকে ভয় পেতে হবে না, অপমানিত হতে হবে না কিংবা বাধার মুখে পড়তে হবে না। ভিন্ন বিশ্বাস ও মতের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস করবে এবং সংস্কৃতি মানুষকে বিভক্ত করার পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ করবে, এমন পরিবেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।
প্রতীতি অস্ট্রেলিয়ার মতে, ধ্বংস, অবজ্ঞা, অপমান ও নৃশংসতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মধ্য দিয়েই একটি জাতি তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
বিবৃতিতে দেশের সচেতন নাগরিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী ও বিবেকবান মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাংলা সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে মানবিকতার চর্চা জোরদার এবং একটি মুক্ত, সহনশীল ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতির শেষাংশে প্রতীতি অস্ট্রেলিয়া আশা প্রকাশ করে, তাদের এই প্রতিবাদী অবস্থান বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে ভূমিকা রাখবে। সংগঠনটির প্রত্যাশা, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষিত থাকবে এবং সমাজে মানবিকতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা আরও শক্তিশালী হবে।