রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনার সাত দিন পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। হামলার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি থেকে অভিযুক্তদের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হলেও এখনো আইনের আওতায় আসেননি অভিযুক্তরা। এতে পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা।
রোববার (১১ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এতে আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, সমকালের প্রতিনিধি মাইনুল ইসলাম রাজু, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আরিফ উজ জামান কোরবান এবং দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল আহত হন।
ঘটনার পরদিনই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হামলায় জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকর্মীর নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে অভিযুক্ত হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি এম আহসান হাবীব, ছাত্রদলকর্মী বিশাল চক্রবর্তী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথী, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, সহসাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম এবং ছাত্রদলকর্মী তানিম রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ ওঠার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতে গত সোমবার রাতে তিন নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে। একই সঙ্গে আরও সাত নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে এম আহসান হাবীব, হাসিবুল ইসলাম ও বিশাল চক্রবর্তীর ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া উসকানিমূলক ফেসবুক পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামের ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। পাশাপাশি আরও চারজনের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত এবং তিনজনকে সতর্ক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে সাংবাদিকদের অভিযোগ, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পরও হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, ভিডিও ফুটেজসহ পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না করা উদ্বেগজনক।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা আরও অভিযোগ করেছেন, হামলার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অনলাইন ও অফলাইনে বিভিন্নভাবে তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁরা।
সাংবাদিকদের দাবি, অভিযুক্তরা সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করা হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মীর কাদির অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বলেন, হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন।
রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এবং হামলায় আহত সাংবাদিক নূর আহসান মৃদুল বলেন, হামলার পরও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা স্বাভাবিক।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বাকি দেড় বছর হয়তো তাঁকে এই আতঙ্ক নিয়েই কাটাতে হবে।
এদিকে রাবি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের জিসান পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার সাত দিন পার হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারা পুলিশের বড় ব্যর্থতা।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাজলা পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তা মোস্তাক জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। ভুক্তভোগীদের চিকিৎসাসংক্রান্ত সনদ সংগ্রহের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এসব সনদ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের পর সিন্ডিকেট সভা আহ্বানের পরিকল্পনা থাকলেও ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় আগেই সভার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের বিষয়েও প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন উপাচার্য।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা বা তদন্ত কমিটির সুপারিশ যথেষ্ট নয়। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।