জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে রান্না করা হল গো-মাংস। ওটিএন বাংলা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক আয়োজনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ১৭তম ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এ আয়োজনের অভিযোগ উঠেছে। সনাতনী শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের হস্তক্ষেপে রান্না শেষ করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা অন্যত্র গিয়ে খাবার গ্রহণ করেন বলে জানা গেছে। ঘটনাটি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সহাবস্থান, সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিবির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষার্থী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আয়োজনের শুরুতে গরুর মাংস রান্নার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছিল। পরে রান্নার বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান। একপর্যায়ে তাদের প্রতিবাদের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের হস্তক্ষেপে রান্না শেষ করে আয়োজকেরা অন্যত্র গিয়ে খাবার গ্রহণ করেন।
এ ঘটনায় সনাতনী শিক্ষার্থীদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের উদ্বেগ, দীর্ঘদিনের দাবির পর ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মন্দিরের জন্য একটি জায়গা পাওয়ার পরও সেই স্থানের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধর্মের শিক্ষার্থীর ধর্মীয় অনুভূতি, উপাসনাস্থল এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রান্নায় ব্যবহার হয় মন্দিরের ইট
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, মন্দিরের ইট চুলা হিসেবে ব্যবহার করে গরুর মাংস রান্না করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ব্যবহার হয় মন্দিরের ইট। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন লিখেছেন, অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কাছে স্পর্শকাতর কোনো স্থানের সামনে এমন আয়োজন করলে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, তা বিবেচনায় রাখা উচিত। তার বক্তব্য, ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সংযম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, মন্দিরের সামনে গোমাংস রান্নার মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে। পোস্টটিতে বলা হয়, সনাতনী শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনের সময় প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তাই এ ধরনের ঘটনা তাদের ধর্মীয় অধিকার ও উপাসনাস্থলের মর্যাদা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং ঘটনার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অধিকার কতটা সুরক্ষিত?
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ধর্মীয় উপাসনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য স্থায়ী জায়গার দাবি জানিয়ে আসছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মন্দিরের জন্য প্রস্তাবিত জায়গায় শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে তারা নিজেরাই ভিত্তিপূজার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
সেই প্রেক্ষাপটে মন্দিরের সামনে রান্নার ঘটনাটি শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু খাবার আয়োজনের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং ধর্মীয় উপাসনাস্থলের প্রতি সম্মান, সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পাসে সমান মর্যাদার পরিবেশ বজায় রাখার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সব শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিরাপদে ধর্মীয় আচার পালন, উপাসনাস্থল ব্যবহার এবং শিক্ষাজীবন পরিচালনার পরিবেশ থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করা, অপমান করা কিংবা কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষার্থীরা। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
এই ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষার্থীরা। তারা কয়েকজন মিলে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করে এবং মোমবাতি হাতে প্রতিবাদ জানায়।
ছাত্রদল নেতার প্রতিক্রিয়া, তদন্তের দাবি
ঘটনাটি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা সামছুল আরিফিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে তাদের উপাসনাস্থলের আশপাশে সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রেখে আয়োজনের স্থান নির্ধারণ করা উচিত ছিল।
তিনি দাবি করেন, মন্দিরের সামনে রান্নার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের অন্য পাশে আয়োজনটি করা যেত। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে আগে মুক্তমঞ্চের আশপাশে বারবিকিউয়ের আয়োজন হলেও গরুর মাংস রান্নার ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচন ও সংশ্লিষ্টদের ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।
সামছুল আরিফিন তার বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবিকে ঘিরে আগের বিরোধের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তার অভিযোগ, মন্দিরের জন্য জায়গা নির্ধারণের সময় শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, বর্তমান ঘটনাটিকেও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি ঘটনাটির পেছনে কেউ উসকানি দিয়েছেন কি না, তা তদন্ত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখার অনুরোধ করেন। তবে তার উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের আগে কারও বিরুদ্ধে দায় বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা সমীচীন নয়।
সামছুল আরিফিনের বক্তব্যের মূল দাবি হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে এবং কোনো ধরনের উসকানি বা পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।
স্থায়ী মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি আগেই জানিয়েছিলেন জয় সাহা
এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দির স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন মন্দিরের সদস্যসচিব জয় সাহা। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়া উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এ দাবি জানান।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মন্দির স্থাপন করেন সনাতন শিক্ষার্থীরা। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দিরের আয়োজনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে মহালয়া উদ্যাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে জয় সাহা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় উপাসনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের জন্য কেন্দ্রীয় মন্দিরের স্থায়ী অবকাঠামো প্রয়োজন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে মন্দিরটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
মহালয়ার অনুষ্ঠানে স্থায়ী মন্দিরের দাবি এবং এর দুই দিন পর মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্নার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় সহাবস্থান ও উপাসনাস্থলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনাকে আরও সামনে এনেছে।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি যাচাই এবং মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্মীয় উপাসনাস্থলের ব্যবহার ও সুরক্ষা, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের স্থান নির্ধারণ এবং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।