কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবি : সংগৃহীত
একজন কবির প্রতিকৃতিতে কালি মাখিয়ে কি তাঁর সৃষ্টি মুছে ফেলা যায়? দেয়াল থেকে ছবি সরিয়ে কি মানুষের স্মৃতি, ভাষা ও অনুভূতি থেকে তাঁকে সরানো সম্ভব? ঢাকার সেগুনবাগিচায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনাটি একটি ছবি বিকৃত করার বিষয় নয়; ভিন্নমত প্রকাশের নামে আমরা কতটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি, তারও একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনা হবে, তাঁর সাহিত্য, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা জমিদারি জীবনের সমালোচনাও হবে। একজন বড় লেখককে জানার জন্য তাঁর অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু সেই প্রশ্নের ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও যুক্তি। বিদ্বেষ ছড়িয়ে, ইতিহাসের খণ্ডিত ব্যাখ্যা দিয়ে কিংবা প্রতিকৃতিতে কালি মেখে কোনো দাবিকে সত্য প্রমাণ করা যায় কি?
এ ঘটনায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারের প্রতিক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণ। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে বিশ্বপরিসরে সম্মানিত করেছেন। তাঁর প্রতিকৃতি বিকৃত করার নিন্দা জানিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির স্থায়ী প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য আমাদের একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়—একজন লেখকের শক্তি তাঁর ছবিতে নয়, তাঁর রচনায় এবং পাঠকের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কে।
বাস্তবতার দিকে তাকালেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। একটি গ্রাফিতি মুছে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু ঘরে ঘরে থাকা বই, মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকা গান কিংবা প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠের অভিজ্ঞতা মুছে দেওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথকে অপছন্দ করার স্বাধীনতা যেমন আছে, তাঁর লেখা পড়ার ও গান শোনার স্বাধীনতাও তেমনি আছে। নিজের পছন্দকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পরিপন্থী।
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বারবার তোলা একটি অভিযোগ হলো, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ এই অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল হাজির করার বদলে প্রায়ই একই কথার পুনরাবৃত্তি করা হয়। একটি দাবি বহুবার উচ্চারিত হলেই তা ইতিহাস হয়ে যায় না। কোনো সভায় তাঁর উপস্থিতি বা বিরোধিতার অভিযোগ তুললে সেই সভার তারিখ, কার্যবিবরণী, সমকালীন সংবাদ কিংবা তাঁর নিজের বক্তব্য দেখানো প্রয়োজন। ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় এই দাবির প্রমাণগত দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও মনে রাখা দরকার। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন—সেই অবস্থান নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করা যায়। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা একই বিষয় নয়। আলাদা সময়ের আলাদা ঘটনাকে এক করে দেখলে ইতিহাসের ব্যাখ্যা ভুল পথে যায়।
বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কিছু তথ্য সুস্পষ্ট। ১৯২৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়; মুসলিম ছাত্রদের আয়োজিত সংবর্ধনাও তার মধ্যে ছিল। ১৯৩৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি.লিট উপাধি দেয়। এসব তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এগুলো থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরাসরি সহায়তা করেছিলেন—এমন সিদ্ধান্তও পৃথক প্রমাণ ছাড়া টানা উচিত নয়। ইতিহাসের ভুল সংশোধন করতে গিয়ে আরেকটি অপ্রমাণিত দাবি প্রতিষ্ঠা করা আমাদের উদ্দেশ্য হতে পারে না।
ঢাকার নবাব পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কও বর্তমানের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। সৈয়দ আবুল মকসুদের ঐতিহাসিক নিবন্ধে দেখা যায়, বঙ্গভঙ্গ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও নবাব সলিমউল্লাহর অবস্থান ভিন্ন ছিল। তবু সেই মতপার্থক্য তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে নষ্ট করেনি। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত অভিনন্দন সভায় সভাপতিত্ব করেন সলিমউল্লাহ এবং কবির প্রতিভার প্রশংসা করেন।
এই উদাহরণের শিক্ষা খুবই বাস্তব। পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বার্থ নিয়ে সলিমউল্লাহর নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবনা ছিল; রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল অন্য রকম। কিন্তু একজনের রাজনৈতিক মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও তাঁর সাহিত্যিক অর্জনকে সম্মান করা সম্ভব হয়েছিল। আজ আমরা কি সেই পরিণত বোধটুকু ধরে রাখতে পারছি? মতপার্থক্য মানেই শত্রুতা নয়, আর একজন স্রষ্টার মূল্যায়ন তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ হতে পারে না।
জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। ‘আমার সোনার বাংলা’র রচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। আবার স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে এর গ্রহণের নিজস্ব ইতিহাস ও তাৎপর্য রয়েছে। একটি গান যে প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল, মানুষের সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় তার অর্থ পরে আরও বিস্তৃত হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই গান দেশের মাটি, প্রকৃতি ও ভালোবাসার প্রকাশ।
জাতীয় সংগীত নিয়ে মতামত দেওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু পরিবর্তনের পক্ষে শুধু রচয়িতার পরিচয় বা তাঁর প্রতি বিরাগ যথেষ্ট যুক্তি হতে পারে না। কী পরিবর্তন প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন এবং তাতে দেশের মানুষের কী কল্যাণ হবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দরকার। রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক নিয়ে আলোচনা দায়িত্বশীলতা ও মানুষের অনুভূতির প্রতি সম্মান দাবি করে।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বুঝতেও শুধু তাঁর জন্মস্থান কিংবা ধর্মীয় পরিচয় দেখলে চলবে না। একজন লেখকের সাংস্কৃতিক অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর ভাষা, সৃষ্টি এবং পাঠকের জীবনে সেই সৃষ্টির প্রভাব দিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ তাঁর গান ও কবিতাকে নিজেদের অনুভূতির ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সেই সম্পর্ক প্রশাসনিক সীমানা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আমাদের সংস্কৃতির শক্তি তার বহুমাত্রিকতায়। এখানে রবীন্দ্রনাথ আছেন, নজরুল আছেন, লালন আছেন, জীবনানন্দ আছেন, শাহ আবদুল করিম আছেন। তাঁদের ভাবনা ও প্রকাশভঙ্গি এক নয়; এই বৈচিত্র্যই আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ। নজরুলকে ভালোবাসতে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করতে হয় না। লালনের গানকে মর্যাদা দিতে অন্য কারও গান নিষিদ্ধ করারও প্রয়োজন নেই। সংস্কৃতিতে ভালোবাসার জায়গা বাড়ানো যায়; একজনকে সরিয়ে অন্যজনের জন্য জায়গা তৈরি করতে হয় না।
এখন প্রয়োজন এমন কিছু উদ্যোগ, যা ক্ষোভ প্রকাশের বাইরে গিয়ে মানুষের জানার সুযোগ বাড়াবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারগুলো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রচলিত দাবিগুলোর দলিলভিত্তিক আলোচনা আয়োজন করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সঙ্গে কবির সম্পর্কের চিঠি, সংবর্ধনার বিবরণ ও সম্মানসূচক উপাধির তথ্য সহজে পড়ার উপযোগী করে তুলে ধরতে পারে। গণমাধ্যম কোনো বিতর্কিত দাবি প্রকাশের সময় তার উৎস ও প্রমাণ পরীক্ষা করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুধু প্রতিবাদ নয়, যাচাইযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কাজও কেবল স্মরণানুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নতুন পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালনসহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্রষ্টাদের রচনা সহজভাবে পৌঁছে দিতে হবে। ছোট পাঠচক্র, উন্মুক্ত আলোচনা, গান শোনার আসর কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রশ্নোত্তর আয়োজন এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। কাউকে শ্রদ্ধা করতে বাধ্য করার চেয়ে তাঁকে জানার সুযোগ দেওয়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
প্রতিকৃতি বিকৃত করার ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে সমালোচনা ও ক্ষতিসাধনের মধ্যে পার্থক্য রাখতে হবে। কোনো লেখকের চিন্তার বিরুদ্ধে যুক্তি দেওয়া আর তাঁর প্রতিকৃতি নষ্ট করা এক ধরনের কাজ নয়। আইন প্রয়োগ যেন বৈধ মতপ্রকাশকে দমন করার অজুহাত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রবীন্দ্রনাথকে সম্মান করার অর্থ তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়। তাঁর লেখা পড়া, সময় ও পরিস্থিতি বোঝা, প্রয়োজন হলে যুক্তি দিয়ে দ্বিমত পোষণ করা—এসবই একজন স্রষ্টার সঙ্গে পরিণত সম্পর্কের লক্ষণ। অন্ধ ভক্তি যেমন বোঝার পথে বাধা, অন্ধ বিদ্বেষও তেমনি।
দেয়ালের একটি ছবি নষ্ট হতে পারে; কিন্তু মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া সৃষ্টি এভাবে মুছে যায় না। রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ কোনো প্রতিকৃতির ওপর নির্ভর করছে না। বরং এই ঘটনাগুলো আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে—আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ব, যেখানে ভিন্নমতের জবাব দেওয়া হবে কালি দিয়ে, নাকি পাঠ, প্রমাণ ও যুক্তি দিয়ে?
রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলার চেষ্টার চেয়ে তাঁকে পড়া ও বোঝার চর্চাই আমাদের বেশি সমৃদ্ধ করবে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ সেখানেই।
সম্পাদক: ড. প্রদীপ রায়
ওটিএন বাংলা, মেলবোর্ন