শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি পূজামণ্ডপে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি। ছবি: সংগৃহীত
শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি পূজামণ্ডপে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সারা বছর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরা হয়। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
সভায় নেতারা আশা প্রকাশ করেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে উদযাপিত হবে। তাঁদের মতে, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও মিলনের সুযোগ তৈরি করে, যা বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। তাঁরা এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানান, যেখানে ঈদ, পূজা, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান ভয়ভীতি কিংবা বিশেষ পুলিশি পাহারা ছাড়াই উদযাপন করা যাবে।
সভায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস (সাধন)। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও কাজল দেবনাথ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, উপদেষ্টা বীরেশ চন্দ্র সাহা এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথসহ অন্য নেতারা।
পাঁচ দিনের নয়, ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তার দাবি
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দুর্গাপূজার প্রস্তুতির মধ্যে সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি জেলায় দুর্গাপ্রতিমা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরে চুরি এবং সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া নওগাঁয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী পরিচয়ে ডাকাতির খবর পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়।
এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। তবে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চেতনা জোরদার এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে এ ধরনের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান নেতারা।
তাঁরা বলেন, শুধু দুর্গাপূজার পাঁচ দিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই চলবে না। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বছরের ৩৬৫ দিন নিরাপত্তা দিতে হবে। পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ এবং অপরাধীদের বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দেশজুড়ে দুর্গাপূজার আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকবে না বলেও জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সুষ্ঠুভাবে পূজা আয়োজনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২২ দফা নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলেও সভায় জানানো হয়।
আট দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত
সভায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অস্তিত্ব রক্ষায় আট দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করে সংগঠন দুটি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ট্রাইব্যুনালের রায়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভুক্তভোগীদের জমির মালিকানা ও দখল ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাতে সরকার, সংসদ এবং জনপ্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তর এবং দুর্গাপূজায় অষ্টমী থেকে দশমী পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও বৈষম্য বিলোপ আইনের খসড়া বিল ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে।