ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ দিন ১৫ অক্টোবর। ১৯৮৫ সালের এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের একটি ভবনের ছাদ ধসে ৩৯ জন শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও অতিথি প্রাণ হারান। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন নিহতদের পরিবার, সহপাঠী, বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
এই শোকাবহ দিনের স্মৃতিকে ধারণ করে এবং নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়া (JHAAA) ১৫ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে সিডনির কিংস ল্যাংলির জিম সাউথি কমিউনিটি সেন্টারে এক স্মরণ ও প্রার্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের আয়োজনে ছিল সমবেত সংগীত, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা, পবিত্র গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ, স্মৃতিচারণ, কবিতা আবৃত্তি, প্রার্থনাসংগীত এবং পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ।
চার দশক পরও বিচার না হওয়ার অভিযোগ
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ সম্পাদক গৌতম দাস মিঠু ১৯৮৫ সালের সেই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিচার না হওয়ার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “আজও এই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। মনে হয় এটা সাজানো ঘটনা ছিল।”
তাঁর এই বক্তব্যে দীর্ঘ চার দশক পরও ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায়বদ্ধতা ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসে। তবে ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল বলে তিনি যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তা একটি ব্যক্তিগত অভিমত, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।

বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করেও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মৃতিকে সযত্নে ধারণ করে চলেছেন। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিতে সেই ভয়াবহ দিন
অনুষ্ঠানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি কামরুল মান্নান আকাশ। তিনি নিজেকে সেই মর্মান্তিক ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উল্লেখ করে সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, “আমি বলতে গেলে একজন প্রত্যক্ষদর্শী। নিজের চোখে দেখেছি সেই বীভৎস দৃশ্য।”
স্মৃতিচারণের একপর্যায়ে তিনি তাঁর বাবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কার কিছু ঘটনার কথাও তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা উপাচার্য থাকাকালে সংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলীকে অন্য একটি ঘটনায় চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পর ওই প্রকৌশলী পুনরায় চাকরিতে বহাল হন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, তাঁর বাবা যখন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা যাতে সরকারি চাকরি না পান, সে জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে কামরুল মান্নান আকাশ বলেন, “এখন তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।”
তাঁর বক্তব্যে অতীতের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের প্রশ্নও উঠে আসে।

সিডনিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস পালিত। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
ভাই হারানোর বেদনা নিয়ে স্মৃতিচারণ
অনুষ্ঠানের আরেকটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, মনোরঞ্জন পালের স্মৃতিচারণ। ১৯৮৫ সালের সেই মর্মান্তিক ঘটনায় নিজের ভাইকে হারিয়েছেন তিনি। একজন স্বজনহারা মানুষ হিসেবে তাঁর স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আপনজন হারানোর বেদনা যে সহজে মুছে যায় না, তাঁর উপস্থিতি ও স্মৃতিচারণে সেই মানবিক সত্যটি আবারও সামনে আসে।
এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জগন্নাথ হলের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কুমার পিয়াল দাস (রজত)। তিনি বলেন আমাদের জগন্নাথ হলের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমাদের সেই হলের ছাত্রদের জন্য কিছু করা উচিত। তিনি সম্প্রতি জগান্নাথ হল গ্লোবাল কানেক্ট এর বানারে একটা ওয়েবিনারের আয়োজন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
প্রার্থনা, সংগীত ও পুষ্পার্ঘ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন
স্মরণানুষ্ঠানের কর্মসূচিতে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক থেকে পাঠের ব্যবস্থা রাখা হয়। নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রার্থনাসংগীত, কবিতা আবৃত্তি এবং অন্যান্য স্মরণমূলক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সাংস্কৃতিক পর্বের সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন আকাশ। অনুষ্ঠান আয়োজনে তুষার রায় ও নির্মল দত্ত সহযোগিতার দায়িত্বে ছিলেন।
পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের সময় নিহতদের আলোকচিত্র প্রজেক্টরে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়, যাতে উপস্থিত সকলে তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
সভাপতির ধন্যবাদ জ্ঞাপন
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি কাজল রায় উপস্থিত অতিথি, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক এবং অংশগ্রহণকারী সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
তিনি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত অতিথিদের জন্য নৈশভোজের আয়োজন রাখা হয়।
প্রবাসেও অমলিন জগন্নাথ হলের স্মৃতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ১৫ অক্টোবরের সেই মর্মান্তিক ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়, এটি অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি এবং একটি প্রজন্মের গভীর বেদনার ইতিহাস।
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করেও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের স্মৃতিকে সযত্নে ধারণ করে চলেছেন।
এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে সেই শোকাবহ ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে মানবিক সংহতি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
“মরণসাগরপারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি। নিখিলে রচিয়া গেলে আপনারই ঘর, তোমাদের স্মরি।”
এই শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়েই জগন্নাথ হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অস্ট্রেলিয়া স্মরণ করল ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবরের সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষদের।