ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবস আজ, স্মরণে ছাদধসে নিহত ৪০ জন
পুরোনো ভবনের ছাদ ধসে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬ শিক্ষার্থীসহ ৪০ জন। চার দশক পেরিয়েও ১৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শোক, স্মৃতি ও মানবিক বেদনার দিন। নিহতদের…
বাংলাদেশে উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার ভয়াবহ বিপদ সামনে এনেছে সাতক্ষীরায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের মৃত্যু। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে বলে অভিযোগ করা একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেবহাটার সখীপুরে ৩০ বছর বয়সী শামীমকে মারধর করা হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয় দেওয়া একটি দল ওই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে তাঁকে আবারও মারধর করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বুধবার ভোরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শামীমের মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো থেকে হামলাকারীদের শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তরিক হয়, তাহলে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে তাদের খুব বেশি অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশে জনতার সহিংসতা গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জনতার সহিংসতায় ১২৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান সমস্যাটির ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে নিহতদের কতজন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, তা এসব সংখ্যা থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক পোশাকশ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে একদল মানুষ। পরে তাঁর মরদেহ ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কোরআন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে পীর আবদুর রহমান, যিনি শামীম নামেও পরিচিত, তাঁকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গণপিটুনি এবং অন্যান্য কারণে সংঘটিত জনতার হামলায় হত্যাকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে এমন নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান বাংলাদেশের প্রয়োজন। তদন্ত, গ্রেপ্তার, বিচারিক কার্যক্রম ও আদালতের রায় সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এসব নথি ছাড়া সমস্যাটির প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা কিংবা অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা কঠিন।
বাংলাদেশের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর সঙ্গে অর্থদণ্ডও হতে পারে। অন্যদিকে, দণ্ডবিধির ২৯৫ক ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপ্রসূত কর্মকাণ্ডের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এই বিধানগুলো আইনি অবস্থান স্পষ্ট করে। কোনো অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করতে হবে, প্রমাণ যাচাই করতে হবে এবং আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হতে হবে। কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী কিংবা উত্তেজিত জনতার শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই।
বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন মামলায় বিচার হয়েছে এবং গুরুতর সাজাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো ঘটনায় গ্রেপ্তার বা দণ্ডাদেশের নজির থাকলেই প্রমাণ হয় না যে দেশজুড়ে জনতার হাতে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে। জবাবদিহির বাস্তব চিত্র মূল্যায়ন এবং আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা শনাক্ত করতে মামলার পরিণতি সম্পর্কে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নথি প্রয়োজন।
শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় ‘তৌহিদি জনতা’র জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, তা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি রাখে। গণমাধ্যম ও মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে এই নামে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ মতপ্রকাশকারী ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মাজার এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে প্রতিবাদ ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
তবে অপরাধীদের পরিচয় এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায় প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো গোষ্ঠীকেই ধর্মীয় অনুভূতিকে হাতিয়ার করে নাগরিকদের ভয় দেখানো কিংবা ফৌজদারি অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সুফি মাজার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। নারীদের পোশাক ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। কোনো গোষ্ঠী যখন হুমকি ও সহিংসতার মাধ্যমে নাগরিকেরা কী বলবেন, কী শেখাবেন, কী পরবেন কিংবা কী বিশ্বাস করবেন, তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন বিষয়টি মৌলিক অধিকার ও সমান নাগরিকত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।
ধর্মীয় স্বাধীনতা একজন মানুষকে নিজের ধর্ম পালন করার অধিকার দেয়। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাখ্যা বা বিশ্বাস অন্যের ওপর সহিংসতার মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কাউকে দেয় না।
বাংলাদেশ তালেবানধাঁচের শাসনব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। ধর্মীয় উগ্রপন্থী তৎপরতার বিস্তার, ধর্মনিরপেক্ষ মতপ্রকাশকারীদের ভয় দেখানো, নারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ওপর হামলা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
আরও তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হলো, কর্তৃপক্ষ কঠোরপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আইনের বাইরে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দিচ্ছে কি না। পুলিশ যে ব্যক্তিকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে, তাঁকে যদি পরে একটি জনতা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে আবারও আক্রমণ করতে পারে, তাহলে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থার ব্যর্থতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
কর্তৃপক্ষ যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ড সহ্য করে, তাহলে সহিংস গোষ্ঠীগুলো মনে করতে পারে যে কোনো পরিণতির মুখোমুখি না হয়েই তারা জনসাধারণের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দখল না করেও এভাবেই ধীরে ধীরে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় কর্তৃপক্ষ কি যথাযথ তদন্ত করবে এবং দুই দফা হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনবে? নাকি আগের অনেক গণপিটুনির ঘটনার মতো তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটিও বিচারহীনতায় শেষ হবে? আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের না হলেও তা যেন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে জনতার সহিংসতার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘু, নারী, সাংবাদিক ও ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদের কার্যকর নিরাপত্তা দেওয়া প্রয়োজন।
শামীমের মৃত্যু আইনের শাসনের জন্য একটি পরীক্ষা। ধর্মীয় অভিযোগ কোনোভাবেই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না। জনতা যদি দায়মুক্তি নিয়ে সহিংসতা চালাতে পারে, তাহলে রাষ্ট্র তার কর্তৃত্ব হারায়। বিচার নির্ধারিত হতে হবে আদালতে, উত্তেজিত জনতার হাতে নয়।
পারভেজ হাসেম
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au