‘কাজ নাই, বেতন নাই’ উত্তরায় ৫ পোশাক কারখানা বন্ধ
বেতন বৃদ্ধি ও বকেয়া মজুরি পরিশোধের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখান এলাকায় পাঁচটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ শ্রম…
চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ তরুণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগীরা মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর প্রায় ৪২ শতাংশ। মৃত্যুর হিসাবেও এই বয়সগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে আক্রান্তের তুলনায় নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৩৩১ জন।
বয়সভিত্তিক হিসাবে, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ১৪ হাজার ৫২২ জন, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১৫ হাজার ৩৮২ জন এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১৫ হাজার ১৯৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই তিন বয়সগোষ্ঠী মিলিয়ে রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজারের বেশি, যা মোট ভর্তি রোগীর প্রায় ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার এবং ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম।
তবে শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। কারণ, বিভিন্ন বয়সগোষ্ঠীর জনসংখ্যার পার্থক্য বিবেচনায় নিতে হয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বয়সগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন রোগতত্ত্ববিদেরা।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া নতুন কোনো প্রবণতা নয়। এ বয়সের মানুষ পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তুলনামূলক বেশি বাইরে থাকেন। ফলে তাঁদের এডিস মশার সংস্পর্শে আসার আশঙ্কাও বেশি হতে পারে। তবে ঠিক কোন কারণে এ বয়সীদের মধ্যে রোগীর সংখ্যা বেশি, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীর প্রায় দ্বিগুণ। দিনের বেলায় এডিস মশার কামড়ানোর প্রবণতা এবং পুরুষদের বাইরে বেশি সময় কাটানোর বিষয়টি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচনায় এলেও, এটিকে আক্রান্তের সংখ্যায় পার্থক্যের নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
নারীদের মৃত্যুহার বেশি
ডেঙ্গুতে আক্রান্তের তুলনায় নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার প্রবণতাও গত কয়েক বছরে দেখা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে মৃত ব্যক্তিদের ৫৭ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০২৪ সালে মোট রোগীর মধ্যে নারীর অংশ ছিল ৬ শতাংশ, কিন্তু মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁদের অংশ ছিল ৫১ শতাংশ। ২০২৫ সালে মোট রোগীর ৩৭ শতাংশ নারী হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে তাঁদের অংশ ছিল ৪৮ শতাংশ।
নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরা অবহেলার শিকার হয়ে থাকতে পারেন। পরিবারের পাশাপাশি নিজেদের সচেতনতা ও চিকিৎসা নিতে দেরি করার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বিশদ বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
মৃতদের ২৬ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছর
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের অংশ প্রায় ২৬ শতাংশ। এ বয়সগোষ্ঠীর মধ্যে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৪৩ জন, ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২২ জন এবং ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ২২ জন মারা গেছেন। সব মিলিয়ে এই তিন বয়সগোষ্ঠীতে মৃত্যুর সংখ্যা ৮৭।
তবে এ বয়সীদের মৃত্যুঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি কি না, তা জানতে আক্রান্ত রোগীর বিপরীতে মৃত্যুর অনুপাত বা কেস ফ্যাটালিটি রেশিও হিসাব করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ববিদেরা।
মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখছে আইইডিসিআর
ডেঙ্গুতে তরুণ ও পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা এবং নারীদের মৃত্যুহার বেশি হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করছে আইইডিসিআর। ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন, চিকিৎসা নিতে দেরি, রোগের জটিলতা কিংবা চিকিৎসাব্যবস্থার ঘাটতি মৃত্যুর ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখছে, তা বোঝার চেষ্টা চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী জানিয়েছেন, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করা হবে। এ জন্য মৃত রোগীদের চিকিৎসার নথি সংগ্রহ, তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা এবং চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হবে। রোগী কখন অসুস্থ হয়েছেন, কখন হাসপাতালে এসেছেন, চিকিৎসায় কোনো বিলম্ব বা ঘাটতি ছিল কি না এবং নির্ধারিত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ২০২৩ সালে অনেক রোগী গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ ওষুধের দোকান বা অননুমোদিত চিকিৎসকের কাছ থেকে স্যালাইন ও ওষুধ নিয়ে সময় পার করেছেন। ফলে হাসপাতালে আসার ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অনেকের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং শক বা একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়।
হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ হাজার ১৯৭ জন। জুনে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ এবং সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। অক্টোবরের প্রথম ১৫ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে ২৭ হাজারের বেশি রোগী।
রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে শয্যা বাড়াতে বলা হয়েছে এবং কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) নুরুল ইসলাম জানান, রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা চালুর প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা সম্ভব হলে ওই ইউনিটে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা বাড়ানো যাবে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই প্রবণতার প্রকৃত কারণ জানতে বয়স, লিঙ্গ, চিকিৎসা নিতে বিলম্ব এবং রোগের জটিলতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, গবেষণার ফলাফল ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে এবং রোগীদের জন্য সময়মতো কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au