দুই মাসের কম সময়ে ফের ঢাকায় ভুটানের রাজা, যাত্রাবিরতির আড়ালে কি ঘটছে?
দুই মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবতরণ করেছে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুককে বহনকারী একটি বিমান। শুক্রবার দুপুরে ড্রুক এয়ারের…
বাঙালির চিরায়ত আবহমান সংস্কৃতিতে উৎসব মানেই আনন্দ-সংকেত, মিলনমেলা এবং সম্প্রীতির অটুট বন্ধন। হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব সেই মিলনের বারতাই নিয়ে আসে আবহমান বাংলা জুড়ে। তবে এছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে উঠে আসা খবরাখবর এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের যৌথ ও পৃথক সংবাদ সম্মেলনের বার্তা যেন একই সাথে দুটি বিপরীতমুখী বাস্তবতা প্রকাশ করে—একদিকে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে অন্তর্নিহিত শঙ্কা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ যে বিষয়টি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত চিত্তে তুলে ধরেছেন, তা হলো পুলিশ, ড্রোন, সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কড়া পাহারায় উৎসব উদযাপন। নিঃসন্দেহে প্রশাসন থেকে পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সিসিটিভি বা ড্রোনের প্রয়োগ বাড়ানো হয়েছে। তবে একটি ধর্মীয় উৎসবে যেখানে আনন্দের অবাধ প্রবাহ থাকার কথা, সেখানে প্রতিমা ও মণ্ডপ পাহারা দেওয়ার জন্য ড্রোনের নজরদারি আর সার্বক্ষণিক পাহারার দরকার পড়াটা কতটা স্বাভাবিক? নেতৃবৃন্দ যথাযথভাবেই মন্তব্য করেছেন যে, রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি নাগরিকদের নির্বিঘ্নে ধর্ম পালনের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি করতে পারতো, তবে উৎসবে সেনা বা ড্রোন পাহারার চাদর জড়াতে হতো না। নিরাপত্তার এই বাড়তি উদ্যোগকে যেমন ইতিবাচক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, তেমনি এটি সমাজদেহে বাসা বাঁধা এক গভীর সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের ক্ষতকেও উন্মোচিত করে।
সংবাদ সম্মেলন ও বিজ্ঞপ্তিতে ঐক্য পরিষদ ও পূজা উদযাপন পরিষদ কেবল মৌখিক ক্ষোভ প্রকাশ করেনি, বরং বাস্তবচিত্র তুলে ধরতে বিভিন্ন জেলায় ঘটে যাওয়া পুজার আগে ৩৪টি পুজামন্ডপে প্রতিমা ভাংচুর, হামলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর খতিয়ান পেশ করেছে। প্রতিমা ভাঙচুর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব কিংবা বিদ্বেষ ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা, এবং বেশ কিছু স্থানে চাঁদা দাবি কিংবা বসতবাড়িতে হামলার অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রোধ এবং যেকোনো মূল্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার যে দাবি তাঁরা জানিয়েছেন, তা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবই যে দুর্বৃত্তদের বারবার উৎসাহিত করে, নেতৃবৃন্দের এই বক্তব্যকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
উৎসবকে সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা সম্প্রীতি সভা ও মণ্ডপ পরিদর্শনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। অনুদান বিতরণ থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন কেউ কেউ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও অনেকে আবার এটা সনাতনী ভোটারদের নিজ দলের পক্ষে বা ভোটের রাজনীতির কৌশল হিসেবে দেখছে।
তবে সচেতন নাগরিকগন মনে করেন সংখ্যালঘুদের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে প্রয়োজন আরও স্থায়ী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান। উৎসব কেবল পাহারায় বা নিছক প্যান্ডেলের আলোকসজ্জায় সীমাবদ্ধ নয়; উৎসবের প্রাণ লুকিয়ে থাকে মনের নিরাপত্তায়।
বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যার জন্মই হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে। যদি বছরের পর বছর নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে তাঁদের প্রধান উৎসব উদযাপনে আশঙ্কায় থাকতে হয়, কিংবা প্রতিটি মণ্ডপে বিশেষ পাহারা বসাতে হয়—তবে তা কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতা নয়, পুরো জাতির মানবিক ও গণতান্ত্রিক সূচকের ওপরই প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।
পূজা উদযাপন পরিষদ ও ঐক্য পরিষদের উত্থাপিত দাবি ও উদ্বেগগুলোকে কেবল অভিযোগ হিসেবে না দেখে, রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজের উচিত একে আত্মপর্যালোচনার একটি বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। এর জন্য সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতার পরিচয় যাই হোক, তাঁকে দ্রুত ও কঠোর আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক গুজব ছড়ানো প্রতিহত করতে সাইবার নজরদারি জোরদার করতে হবে। কেবল পুলিশ বা রাজনৈতিক পাহারা নয়, স্থানীয় সকল ধর্মের বাসিন্দাদের নিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করা প্রয়োজন, যা বাস্তবে সম্প্রীতির আবহ ফুটিয়ে তুলবে।
দুর্গাপূজার মূল সুর—অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ ও সুন্দরের জয়। আশা করা যায়, শারদীয় দুর্গোৎসবের এই আলোর রশ্মি সব ধরনের সংকীর্ণতা, আতঙ্ক ও বৈষম্যের কালো মেঘ দূর করে দেশের সকল নাগরিকের মনে সত্যিকারের অনাবিল শান্তি ও নিরাপত্তার জোয়ার নিয়ে আসবে।
( মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সহ সম্পাদক)
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au