হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আজ মহাসপ্তমী। দেবী দুর্গার আরাধনা, অঞ্জলি ও পূজার নানা আনুষ্ঠানিকতায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলো। শাস্ত্রীয় আচার মেনে ষোড়শ উপাচারে দেবীর পূজা করছেন ভক্তরা। রাজধানী ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন মন্দিরে সকালে শুরু হয়েছে মহাসপ্তমীর পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার সপ্তমী তিথি দুই দিন বিস্তৃত হওয়ায় ১৭ অক্টোবর শনিবার বিকেল থেকে শুরু হয়ে ১৮ অক্টোবর রবিবার বিকেল পর্যন্ত থাকছে। হিন্দু শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী, সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি থাকে, সাধারণত সেই তিথি ধরে পূজার দিন নির্ধারণ করা হয়। তিথির সময়কাল দুই দিনের সূর্যোদয়কে স্পর্শ করায় এবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এতে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতায় কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গার পূজা করা হয় ষোড়শ উপাচারে, অর্থাৎ ষোলো ধরনের উপকরণ দিয়ে। সকালে দেবীর চক্ষুদানসহ আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ নিবেদনের মধ্য দিয়ে পূজা সম্পন্ন করা হয়। চণ্ডীপাঠ ও মন্ত্রোচ্চারণের পাশাপাশি দেবীর পায়ে অঞ্জলি দেওয়া এবং প্রসাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দিনভর চলবে পূজার আয়োজন।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হওয়ার পর থেকেই ভক্তদের মধ্যে দুর্গোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। দেবী দুর্গা মানুষের দুঃখ-কষ্ট, ভয় ও বাধা দূর করেন, এমন বিশ্বাস থেকেই ভক্তরা তাঁর কাছে শান্তি, কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করেন।
দুর্গোৎসবের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন মহাষ্টমী। আগামীকাল সোমবার, ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে অষ্টমীর পূজা। এদিন কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার পাশাপাশি রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন মন্দিরে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কুমারী পূজায় একজন অবিবাহিত বালিকার মধ্যে দেবীর মাতৃরূপ কল্পনা করে তাঁকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে এ আয়োজন বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে।
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে মহানবমী। এদিনের পূজায় অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করা হবে। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত সন্ধিপূজাও দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার। শাস্ত্রীয় হিসাব অনুযায়ী, অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট মিলিয়ে মোট ৪৮ মিনিট ধরে সন্ধিপূজা করা হয়। এ সময় দেবী চামুণ্ডার আরাধনা করা হয়।
বুধবার, ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গাপূজা। এদিন প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা থেকে বিসর্জনের আয়োজনের কথা রয়েছে। রাজধানীতে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে পলাশীর মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়ে সদরঘাটের ওয়াইজ ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গার গমন হবে নৌকায়।
এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে ছুটিও বাড়ানো হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশে পূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটিসহ ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার ঢাকা মহানগরে ২৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬১টি। অর্থাৎ মহানগরে এবার তিনটি মণ্ডপ কমেছে। অন্যদিকে, সারা দেশে এবার মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে, যা গত বছরের ৩২ হাজার ৩৫১টির তুলনায় ১ হাজার ৫০০টি বেশি। এ হিসাবের মধ্যে প্রতিমার পাশাপাশি ঘটে আয়োজিত পূজাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মহাসপ্তমীর পূজার মধ্য দিয়ে আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্গোৎসবের আনন্দ আরও ছড়িয়ে পড়ছে। পূজা, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবী দুর্গার আশীর্বাদ কামনা করছেন। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের পাঁচ দিনের প্রধান দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।